ইরানের সামরিক শক্তি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে প্রকাশ্য দাবি করে আসছেন, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। চলতি মাসের শুরুর দিকে তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক গোপন মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরান তাদের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, লঞ্চার এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে কার্যকর প্রবেশাধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, হরমুজ প্রণালি বরাবর ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিরই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে তেহরান। এর ফলে সরু ওই জলপথ এবং এর আশপাশের অঞ্চলে চলাচলকারী যুক্তরাষ্ট্রের রণতরী এবং তেলের ট্যাংকারগুলো এখন সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির মুখে পড়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এই ঘাঁটিগুলোর ভেতরে থাকা মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে অথবা সরাসরি নির্দিষ্ট লঞ্চপ্যাড থেকে নিক্ষেপ করতে পারে। বর্তমানে মাত্র ৩টি ঘাঁটি ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ এখনো অক্ষত রয়েছে। এর মধ্যে যেমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বল্পপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া দেশটির ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই বর্তমানে আংশিক বা পূর্ণমাত্রায় সচল বলে জানানো হয়েছে।
এই তথ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের গত কয়েক মাসের প্রকাশ্য আশ্বাসের বিপরীত। ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী ‘নিশ্চিহ্ন’ এবং তারা আর কোনো হুমকি নয়। তবে, হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এবং পেন্টাগন মুখপাত্র জোয়েল ভালদেজ এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে নাকচ করে দিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী ওয়েলস বলেন, ইরান ভালো করেই বোঝে যে তাদের ‘বর্তমান পরিস্থিতি টেকসই নয়’। অলিভিয়া ওয়েলস আরও মন্তব্য করেন যারা ভাবছেন, ইরান তার সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করেছে, তারা হয় বিভ্রান্তিতে আছেন, না হয় ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের হয়ে কথা বলছেন। ট্রাম্প বিষয়টিকে ‘ভার্চুয়াল দেশদ্রোহিতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে, এক মাসব্যাপী ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে বড় ধরনের সংকটে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানকে মোকাবিলা করতে গিয়ে দেশটির সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাস্ত্র, যেমন টমাহক ক্রুজ মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে ফেলেছে। এই ঘাটতি পূরণে কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। লকহিড মার্টিনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করলেও, তা ট্রাম্পের চাহিদামতো দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও তার সামরিক উপদেষ্টারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেমন বাড়িয়ে দেখেছেন, তেমনি ইরানের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছেন।
এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করেছে ইরাক ও পাকিস্তান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষক ক্লদিও স্টয়ার বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে এমন একটি অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে, যেখান থেকে সাধারণত বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে। যদিও ইরান শুরুতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে চেয়েছিল, তবে এখন সেই অবস্থান বদলাচ্ছে। ক্লদিও স্টয়ার আরও বলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার অবস্থান থেকে সরে এসে এখন সেখানে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করছে। হরমুজ এখন আর নিরপেক্ষ নৌপথ নয়, এটি এখন নিয়ন্ত্রিত করিডর। ইরাকের বেশির ভাগ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়েই রপ্তানি করা হয়।
অন্যদিকে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। একইসঙ্গে এই সংঘাতের প্রভাবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
