জলাতঙ্ক রোধ

চাই টিকাদান কার্যক্রম

আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ১২:১৯ এএম

জলাতঙ্কে রোগে আক্রান্ত হয়ে গাইবান্ধায় ও ঢাকায় মোট ১১ জনের মৃত্যুর পর এ রোগ বিষয়ে কিছুটা আলাপ শুরু হয়েছে। দেশ রূপান্তরে গতকাল শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে শুধু রাজধানীতে প্রতিদিন জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ১২শ থেকে ১৪শ। এ সংখ্যাই প্রমাণ করে, রোগটি মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। কিন্তু মানুষের আক্রান্ত হওয়ার এ প্রবণতা রাতারাতি তৈরি হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৫ সালে এ রোগে মারা গেছে ৮৩ জন মানুষ; ২০১৬ সালে ৬৬ জন, ২০১৭ সালে ৮০ জন, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ৫৭ জন করে এবং ২০২০ সালে ২৬ জন। অর্থাৎ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ বছর কমেছে। কিন্তু পরের বছর ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা টানা বেড়েছে। ২০২১ সালে মারা গেছে ৪০ জন, ২০২২ সালে ৪৫ জন, ২০২৩ সালে ৪৭ জন, ২০২৪ সালে ৫৬ জন ও ২০২৫ সালে ৫৯ জন। ২০২১ সাল থেকে মৃত্যু বাড়ার ধারাবাহিক তথ্যই বলে দিচ্ছে, সরকার এ বিষয়ে কতটা উদাসীন ছিল। এই উদাসীনতার সুযোগে জলাতঙ্ক আমাদের পিছু নিয়েছে, সবার অলক্ষ্যে।

আরও খারাপ খবর হচ্ছে, বেওয়ারিশ কুকুরের জন্য টিকা ২০২২ সাল থেকেই সরকারের কাছে নেই। অর্থাৎ গত চার বছর জলাতঙ্কের টিকা কেনা হয়নি। ফলে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ। এদিকে মহানগরে এমন কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। পথে-ঘাটে কুকুরের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী অনেক শিশু-কিশোর ও বয়স্ক মানুষ। রোগাক্রান্ত বা পাগলাটে কুকুর তাদের কামড়ে দিচ্ছে। তাদের দেহে কুকুরের লালাবাহিত জীবাণু ঢুকছে। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কুকুরের কামড়েই জলাতঙ্ক ছড়াচ্ছে। আরেকটি তথ্য অনুযায়ী, এমন অনেকেই আছেন, যারা বারবার আক্রান্ত হন এবং বারবার টিকা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিড়ালের দ্বারা আক্রান্ত। বাকিরা কুকুরের দ্বারা। অথচ ২০২২ সাল থেকে কুকুরের টিকা কেনার উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। আর বিড়ালের আঁচড়ের ক্ষেত্রে কী প্রতিক্রিয়া হয়, তা কি আদৌ কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের দাবি অনুযায়ী, জলাতঙ্কে আক্রান্ত মানুষের জন্য টিকার এখন অভাব নেই। কিন্তু কুকুরকে আগেই দেওয়ার জন্য যে টিকা, তা তো সরকারের হাতে নেই। জলাতঙ্কে মানুষের মৃত্যু বাড়তে থাকার মুখে সরকার কেন অগ্রাধিকারভিত্তিতে কুকুরের টিকা কিনছে না?

জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী। একবার আক্রান্ত হলে মানুষকে বাঁচানো যায় না। এ কারণে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া জরুরি। যদি কুকুর কামড়ায়, বিড়াল আঁচড় দেয়, রক্ত বেরোয়, প্রাথমিক ব্যবস্থার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিতে পারলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ সম্ভব। তবে সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা হচ্ছে, আগাম টিকা নেওয়া। কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণী পোষা আজকাল নাগরিক চর্চায় পরিণত হচ্ছে। আর্থিক সামর্থ্য যাদের আছে, তারা হয়তো টিকাসহ প্রাণীর প্রয়োজনীয় যত্ন নেন। কিন্তু সব নাগরিক কি এ বিষয়ে সচেতন? টিকা দেওয়াসহ যত্ন নেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য কি সবার আছে? পথে-ঘাটে বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালের টিকার খবর কে রাখে? তাহলে কি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কেই থাকতে হবে? এর কিছুটা সমাধান হতে পারে, প্রাণীদের জন্মনিরোধক টিকা দেওয়া এবং বেওয়ারিশ প্রাণীদের রোগ-প্রতিরোধী টিকার আওতায় আনা। সরকার কেন বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়াল জন্মনিয়ন্ত্রণের আওতায় আনেনি, সেই প্রশ্ন আমাদের। এটা ঠিক, সরকারের একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। নাগরিকদের নিজেদের উদ্যোগেই জলাতঙ্কের টিকা নিতে হবে। আমরা বেওয়ারিশসহ কোনো পশু-প্রাণী হত্যার সমর্থক নই। প্রাণীদের বাঁচানোর পক্ষে আমরা। এ কারণে কুকুর-বিড়ালের জন্মনিয়ন্ত্রণ ও টিকার ব্যবস্থা জরুরিভিত্তিতে দিতে হবে। মানুষকে জলাতঙ্ক থেকে রক্ষা করতে সরকারের কাছে এটুকু আশা আমরা করতেই পারি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত