দেশের অধিকাংশ মুসলমান ইসলাম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। মুসলিম জনসাধারণের মাঝে দ্বীন সচেতনতার অভাব রয়েছে। তারা ইসলামি শিক্ষাকে না নিজের জন্য প্রয়োজন মনে করে, না তার নিজ সন্তানের প্রয়োজন মনে করে। এর বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
এক. অভিভাবকদের দ্বীনের বুঝ না থাকা। প্রতিটি মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা ফরজ। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলমান নামাজ-রোজাকে ফরজ মনে করে, কিন্তু ইলমে দ্বীন নিজে শিক্ষা করা এবং অধীনস্থদের শিক্ষা দেওয়াকে ফরজ মনে করে না।
দুই. মুসলিম সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যে প্রাথমিক স্কুলে পাঠানো হয়, সেখানে কোনো ধর্মীয় শিক্ষক নেই। যেখানে ঘরে নিজ মা-বাবা দ্বীন শিখেনি, তাদের কাছ থেকে সন্তানরাও কিছুই শিখেনি। আর স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা কে দেবে?
তিন. প্রাথমিক শিক্ষা সিলেবাসে কারিকুলামে ইসলামিয়াত বিষয়টি ঐচ্ছিকভাবে। আগের শিক্ষা সিলেবাসে বিষয়টা আবশ্যকীয় ছিল, আগের সরকার বিষয়টি ঐচ্ছিক করে দিয়েছে।
চার. বাংলাদেশের সংবিধানেও ইসলামি শিক্ষার কোনো কথা উল্লেখ নেই। সংবিধানে বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ না থাকার কারণে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম থাকার পরও দ্বীনি শিক্ষার আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা নীতিটাই সবক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়।
পাঁচ. আমাদের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা নির্বাচনের আগে দেশের জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগান। নিজ নিজ দলকে ধর্মীয় মূল্যবোধের বিশ্বাসী দল হিসেবে প্রচার করেন। মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন, পীর-বুজুর্গদের কাছে দৌড়াদৌড়ি করেন। প্রতিশ্রুতি দেন, তারা ক্ষমতায় গেলে ইসলামবিরোধী কোনো আইন করবেন না। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসে শুধু আলু, ডাল, চাল নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা, এ প্রজন্মের শিক্ষার মডেল হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। মন্ত্রীরা ‘কওমি শিক্ষার সংস্কার করবেন’ বলে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বলে থাকেন, কওমি শিক্ষাকে মূল ধারার শিক্ষার সঙ্গে একীভূত করবেন। কওমি শিক্ষা সংস্কার করে কারিগরি শিক্ষা যুক্ত করে কওমি শিক্ষা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করবেন। কওমি শিক্ষার প্রতিটি স্তরে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা, স্কুল, কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসার মতো সনদের স্বীকৃতি প্রদান করবেন।
অর্থাৎ কওমি শিক্ষাকে সনদসর্বস্ব শিক্ষায় রূপান্তর করবেন। যা কওমি শিক্ষার স্বকীয়তা ও বিশেষায়িত শিক্ষাকে ধ্বংসের কৌশল। আমাদের কথা স্পষ্ট, যদি কওমি শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন আনতে চান, তাহলে কওমি ঘরানার স্কলার, বুজুর্গ ওলামায়ে কেরাম আছেন, সরকার স্বীকৃত ৬টি বোর্ড আছে, সংস্কারের ক্ষেত্রে তাদের মতামত নিতে হবে। এর বাইরে কিছু করা যাবে না।
ছয়. কওমি শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে। এটা সবাই জানেন ও স্বীকার করেন, কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষিত হাফেজ-আলেমরা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে থাকেন। প্রতি বছর আমাদের দেশের হাফেজরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছেন। মাদ্রাসাশিক্ষিত আলেমরা নিঃস্বার্থ, দেশপ্রেমিক, মানবিক আদর্শে সুনাগরিক সৃষ্টি করে থাকেন। কওমি ঘরানার আলেমরা দেশের প্রতিটি অঞ্চল, মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা, ইমামতি, বিয়ে-শাদি, দাফন-কাফন, জানাজা আলেমরাই করে থাকেন। করোনা মহামারীর সময় কওমি ওলামায়ে কেরাম জীবনবাজি রেখে কভিড আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছেন তাদের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেছেন। তখন মৃত ব্যক্তির কাছে তার স্বজনরাও উপস্থিত থাকতেন না। দেশে কোনো যোগ্য কওমি আলেম বেকার নেই, চাকরির দাবিতে তারা কোনোদিন রাস্তায় নামেননি, ধর্মঘট, অবরোধ করেননি। দেশে যেমন তাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে, তেমনিভাবে স্ব-মর্যাদায় বিশ্বব্যাপী তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। এমনকি প্রবাসী আলেমদের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স দেশে আসে। আদর্শ দায়িত্বশীল নাগরিক গঠনে কওমি ওলামায়ে কেরামের অবদানকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
বর্তমান সময়ের অপরিহার্য দাবি হলো, নিজেদের মতানৈক্য পরিহার করে দ্বীন ইসলামকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য আগত প্রজন্মের ইমান, আকিদা, তাহজিব-তমদ্দুন রক্ষার্থে এবং দ্বীনিব্যক্তিত্ব সৃষ্টি ও তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য সর্বত্র মক্তব প্রতিষ্ঠা করা। সংবিধান, শিক্ষা আইন, শিক্ষানীতি ও শিক্ষা কারিকুলামে মুসলমান সন্তানদের ইসলামি শিক্ষাকে সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনমত সৃষ্টি করা।
লেখক : সভাপতি, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ
