পুলিশ দেখে না এনার বাস

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০২:৩২ এএম

দুর্নীতির অভিযোগে সড়ক মালিক পরিবহন সমিতির সাবেক মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহর মালিকানাধীন ১৭৯টি বাস জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। এরপর এক বছর পার হলেও আদেশটি তামিল করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ পুলিশ। দুদক বলছে, তারা পুলিশের সহায়তা নিয়ে বাসগুলো জব্দের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ হিসেবে পুলিশ দুদককে জানিয়েছে, বাসগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজধানীর মহাখালীসহ বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে প্রায় প্রতিদিনই এনা পরিবহনের গাড়িগুলো যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে, আসছে। সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করছে। কিন্তু দুদক ও পুলিশ গাড়িগুলো চোখে দেখে না।

সরেজমিন গত ১৬ মে দুপুরে মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, এনা পরিবহনের ঢাকা-হবিগঞ্জ রুটের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৮৮৮৪) যাত্রী নিতে অপেক্ষায় রয়েছে। এর পেছনেই ছিল একই মালিকের ঢাকা-সিলেট রুটের আরেকটি গাড়ি। জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটে  এনার  গাড়িগুলো নিয়মিত চলাচল করে।

আদালতের আদেশ থাকার পরও কেন এসব গাড়ি জব্দ করা হচ্ছে না, তা জানতে চাইলে দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের সহায়তা নিয়ে গাড়ি জব্দের চেষ্টা করেছে দুদক। কিন্তু জব্দ করা সম্ভব হয়নি। পরে কয়েকটি সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করে চেষ্টা করা হয়েছে। তখনো সম্ভব হয়নি। যেহেতু পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ আছে, পুলিশ সড়ক-মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করে, তারা চেষ্টা করলে গাড়িগুলো চিহ্নিত করে জব্দ করা সম্ভব হবে, তাই এ দায়িত্ব পুলিশকে প্রদানের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। আদালত গাড়িগুলো জব্দ করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়। এখন গাড়ি জব্দ করার বিষয়টি পুলিশ ভালো জানে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আদালতের আদেশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘ইতিমধ্যে তিন-চারটি গাড়ি ক্রোক করেছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা তৎপর আছি।’

আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমরা যখন গাড়িগুলো ক্রোক করতে খোঁজাখুঁজি করি, তখন পাওয়া যায় না।

গাড়িগুলো হয়তো ঢাকা মহানগরের বাইরে চলাচল করে থাকে। তাই আমরা পুলিশ সদর দপ্তর চিঠি দিয়ে বলেছি, এসব গাড়ি ক্রোক করতে সারা দেশের পুলিশকে কাজে লাগাতে হবে।’

খন্দকার এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস থেকে দৈনিক ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছে দুদক। এ ছাড়া, তার মালিকানাধীন এনা ট্রান্সপোর্ট (প্রাইভেট) লিমিটেডসহ বিভিন্ন কোম্পানির এসি ও নন-এসি মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ বাস থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হয়। গাড়ির আয় ও চাঁদাবাজির অর্থ হন্ডির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করা হয়। এ অভিযোগ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পাওয়ার পর অনুসন্ধানে মাঠে নামে দুদক। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এনায়েত উল্লাহ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেয় আদালত।

দুদকের উপপরিচালক মো. সাইদুজ্জামান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত বছরের ৪ মে ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতে খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে থাকা ১৮২টি গাড়ি জব্দ করার আদেশ চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, অভিযোগের অনুসন্ধানের সময় এনায়েত উল্লাহ, তার স্ত্রী নার্গিস সামসাদ, ছেলে রিদওয়ানুল আশিক ও মেয়ে চামশে জাহান নিশির এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানির নামে থাকা গাড়িগুলো হস্তান্তর করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আদালত শুনানি শেষে এনা পরিবহনের গাড়িগুলো জব্দ করার আদেশ দেন। এরপর দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ‘টাইপের ভুলের’ উল্লেখ করে আদালতের আদেশের একটি সংশোধনী চেয়ে আবেদন করলে তা আমলে নিয়ে ১৭৯টি গাড়ি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। আদালত গাড়িগুলো জব্দের পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিআরটিসিকে রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দেয়।

আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর গাড়িগুলো রিসিভারের কাছে হস্তান্তর করতে দুদক এনা পরিবহন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। কিন্তু এনা কর্তৃপক্ষ বাসগুলোর হস্তান্তর না করায় দুদক পুলিশ মহাপরিদর্শক ও বিআরটিসির চেয়ারম্যানের মনোনীত প্রতিনিধি, দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক এবং বিআরটিএর উপপরিচালক সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গাড়িগুলো রিসিভারকে বুঝিয়ে দিতে এনা পরিবহন কর্তৃপক্ষকে নোটিস দেওয়া হয়। কিন্তু এনার আইনজীবী জব্দ করা গাড়িগুলো হস্তান্তরে অপারগতার কথা লিখিতভাবে জানান। অন্যদিকে, বিআরটিসি ১৭৯টি গাড়ি বুঝিয়ে দিতে আদালতে আবেদন করে।

রিসিভারকে বুঝিয়ে না দেওয়ায় গাড়িগুলোর অবস্থান শনাক্ত করে সেগুলো পুলিশের দখলে নেওয়ার জন্য আদেশ চেয়ে দুদক আদালতে আবেদন করে। ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত আবেদনটি আমলে নিয়ে গাড়িগুলোর অবস্থান শনাক্ত করে তা পুলিশের দখলে নিয়ে আদালতকে অবহিত করতে নির্দেশ প্রদান করেন। গত ১ ডিসেম্বরের ওই আদেশের পরও অধিকাংশ গাড়ি জব্দ করা হয়নি।

পরিবহন মালিক সমিতির তথ্যমতে, এনার প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। সেই হিসেবে তার গাড়ি থেকে দিনে প্রায় ১৮ লাখ থেকে ২৬-২৭  লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়, যা সব মিলিয়ে মাসে সাড়ে ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা। গাড়িগুলো জব্দ করে বিআরটিসির অধীন চলাচল করলে এসব আয় সরকারি কোষাগারে জমা হতো। কিন্তু সেটি না হয়ে এ অর্থের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে দুবাই ও ব্যাংককে খন্দকার এনায়েত উল্লাহর কাছে চলে যায়। এতে সরকার মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

এদিকে, এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলা করেছে। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর রাজধানীর রমনা থানায় দায়ের করা মামলায় ১০৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ও তার পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৯৯টি ব্যাংক হিসাবে মোট ২ হাজার ১৩১ কোটি টাকা জমা হয়েছে। আর এসব হিসাব থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ২ হাজার ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনা ট্রান্সপোর্টের ৪৩টি হিসাবে জমা হয় ৯৩৪ কোটি টাকা। এনা ফুড অ্যান্ড বেভারেজের আটটি হিসাবে জমা ৪১০ কোটি টাকা এবং এনায়েত উল্লাহর ব্যক্তিগত ৭৪টি হিসাবে জমা হয় ৪৫৯ কোটি টাকা। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্জিত এই বিপুল অর্থ অর্জিত হয়েছে।

দুদক ও সিআইডির তথ্যমতে, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান খন্দকার এনায়েত উল্লাহ আশির দশকের পরে পরিবহন ব্যবসায় নামেন। অংশীদার হিসেবে একটি পুরোনো বাস দিয়ে শুরু করলেও কয়েক বছরেই ২০টি বাসের মালিক হন। প্রথমে তিনি বিএনপির রাজনীতি করতেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর তিনি পরিবহন খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি ও তার সহযোগীরা সিন্ডিকেট গড়ে বাস মালিকদের কাছ থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করতেন। এ ছাড়া তার নিয়ন্ত্রণাধীন ৫০০ থেকে ৬০০ গাড়ির আয় ও চাঁদাবাজির অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে তিনি দেশের বাইরে পাচার করেন।

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই এনায়েত উল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যরা বিদেশে পালিয়ে যান। এ কারণে অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত