সিংহভাগই ভিনদেশের পকেটে

আপডেট : ২০ মে ২০২৬, ০৮:২৩ এএম

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের সমস্যা কাটছেই না। একটি শেষ হচ্ছে তো আরেকটি উঁকি মারছে। এগুলো সমাধান করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে কর্তৃপক্ষ। তারপরও থেমে নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধন করতে তোড়জোড় চলার মধ্যে সুযোগ নিচ্ছে প্রকল্পে অর্থায়নকারী জাপান। এ নিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। সর্বশেষ বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছে টার্মিনাল পরিচালনা করবে জাপান। এতে মোটা অঙ্কের রাজস্ব নিয়ে যাবে দেশটি। রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপান আর বাংলাদেশ পাবে মাত্র ২৭ শতাংশ। রাজস্বের সিংহভাগ ভিনদেশের পকেটে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) নীতিগতভাবে টার্মিনাল পরিচালনার সিদ্ধান্তের কথা জানালেও আরেকটি সমস্যা সামনে এসেছে। থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অর্ধেক পরিচালনা করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বাকি অর্ধেক অংশ পেতে চার দেশের মধ্যে লড়াই চলছে। দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ বৈঠক করলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।

জানতে চাইলে বেবিচক সদস্য (অপারেশন) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবকিছু প্রায় চূড়ান্ত। সরকার ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল চালুর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সে অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছি আমরা।

চার দেশের লড়াই : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দেশের অ্যাভিয়েশন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক অবকাঠামো শাহজালাল বিমানবন্দরের ‘থার্ড টার্মিনাল’। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান অ্যাভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্যে নির্মিত এ টার্মিনাল ঘিরে এখন দেশি-বিদেশি মহলে তুমুল স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিমানবন্দরের সবচেয়ে লাভজনক খাত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং। দীর্ঘদিন ধরে একক আধিপত্য বজায় রাখা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবার এককভাবে এ টার্মিনালের দায়িত্ব পাচ্ছে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজের সর্বোচ্চ অর্ধেক পেতে যাচ্ছে বিমান। বাকি অর্ধেক অংশ অন্য একটি বা দুটি দেশ পাবে। বিষয়টি কাগজে-কলমে চূড়ান্ত না হলেও নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাকি অর্ধেক অংশের কাজ পেতে জাপান, আরব-আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও তুরস্কের মধ্যে লড়াই চলছে। তবে বহুল আলোচিত এ টার্মিনালের রাজস্ব নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। সর্বশেষ গত মাসের শেষ সপ্তাহে বৈঠক হয় জাপানের সঙ্গে।

ভিনদেশের পকেটেই সিংহভাগ রাজস্ব : রাজস্ব আদায়ের সিংহভাগ পাচ্ছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, পরিচালনা সংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান খাত থেকে আদায় করা রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপান, আর মাত্র ২৭ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় চূড়ান্ত হয়েছে। গত ১৭ মে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল জমা দিয়েছে বেবিচক। আগামী ৪২ দিনের মধ্যে চুক্তি সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা থাকায় ৩০ জুনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে।

চূড়ান্ত হওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, এমবার্কেশন ফি আদায়, দোকানপাট ও লাউঞ্জ ভাড়া, কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ ও কার পার্কিং ভাড়া থেকে যেসব রাজস্ব আয় হবে তার ৭৩ শতাংশ জাপানের প্রতিষ্ঠান নিয়ে যাবে। তবে বিমানবন্দরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত সরাসরি বেবিচকের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এর মধ্যে আছে ওভারফ্লাইং চার্জ ও বিমান অবতরণ ফি আদায়, কাস্টম, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম।

কৌশলে ‘রাজস্ব হাইজ্যাক’ হচ্ছে : রাজস্বের প্রসঙ্গে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের সিংহভাগ অর্থায়ন এসেছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা থেকে। স্বাভাবিকভাবেই টার্মিনাল পরিচালনা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে জাপানি কনসোর্টিয়াম অগ্রাধিকার দাবি করছে। জাপান সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে বরাবরই চাপ রয়েছে, যেন তাদের অভিজ্ঞ সংস্থাকে এ কাজের বড় অংশ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারও তাতে রাজি হয়েছে। জাপান কৌশলে আমাদের রাজস্ব ‘হাইজ্যাক’ করে নিয়ে যাচ্ছে। দেশ আমাদের, ঋণের টাকা পরিশোধ করছি আমরা।

আর জাপান হচ্ছে লাভবান। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়েও আমরা পিছিয়ে পড়ছি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৫০ শতাংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করতে পারবে। অথচ বিমানের সব ইকুইপমেন্ট আছে। বর্তমানে দেশের সবকটি বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করছে বিমান। বাকি ৫০ ভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চারটি দেশ রীতিমতো যুদ্ধ করছে। তবে সরকারের উচিত হবে পুরো অংশই বিমানকে দেওয়া।

অর্থনীতিতে চাপ পড়বে : জানা গেছে, বিমানের সেবা কমে আসায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং দিতে চাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগমনে বিমানবন্দরের সেবার মান বিশ^মানে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিমানের একচেটিয়া রাজত্বের অবসান ঘটায় একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। আবার কৌশলগত ও নিরাপত্তার দিক থেকে বিমানবন্দর একটি দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থান। এখানে শতভাগ বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বা বড় অংশ বিদেশি এজেন্সির হাতে ছেড়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আবার লভ্যাংশ বাবদ বিপুল পরিমাণ ডলার বিদেশে চলে গেলে দেশের অর্থনীতিতেও বাড়তি চাপ পড়বে।

বিশাল দেনা পরিশোধ করছে সরকার : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টার্মিনালের অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ দুবছর আগে শেষ হলেও পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, আয় বণ্টন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে এত দিন চালুর প্রক্রিয়া আটকে ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ঝুলে থাকা পাওনা ১৬০০ কোটি টাকাও পরিশোধ করা হয়। অতিরিক্ত কাজের টাকা পরিশোধও চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। সবশেষ থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও জাপানের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে পরিচালনা কাঠামো, সেবার মান, আন্তর্জাতিক অপারেশন, প্রযুক্তি ব্যবহার ও রাজস্ব বণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

অবাস্তব শর্তে আটকে ছিল চুক্তি : থার্ড টার্মিনালের নকশা করেছেন বিখ্যাত স্থপতি রোহানি বাহারিন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে টার্মিনালটি ‘সফট ওপেনিং’ হওয়ার পর ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এটিকে পুরোদমে যাত্রীসেবার জন্য উন্মুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা জটিলতার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য জাপানের একাধিক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। তবে কনসোর্টিয়াম বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। উচ্চহারে ল্যান্ডিং চার্জ, যাত্রী সুরক্ষা ফি ও বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি থেকে আয়ের অংশীদারত্ব ও বাণিজ্যিক স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেবিচকের অস্বস্তি তৈরি হয়। শর্তগুলো অবাস্তব মনে হওয়ায় চুক্তি আটকে ছিল।

টার্মিনালের ভেতরে যা থাকছে : থার্ড টার্মিনালে কেবিন এক্স-রে মেশিন ৪০টি, বোর্ডিং ব্রিজ ১২টি, কনভেয়ার বেল্ট ১৬টি, বডি স্ক্যানার ১১টি, টানেলসহ বহুতলবিশিষ্ট কার পার্কিং ৫৪ হাজার বর্গমিটার, নতুন ইমপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স ও এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স ৬৩ হাজার বর্গমিটার, শোল্ডার সাড়ে ৯৬ হাজার বর্গমিটার, জিএসই রোড ৮৩ হাজার ৮০০ বর্গমিটার, সার্ভিস রোড ৩৩ হাজার বর্গমিটার ইত্যাদি থাকছে। টার্মিনালের অন্যতম আকর্ষণ ফানেল টানেল। ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার অ্যাপ্রোন ও ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি রাখার সুবিধা, ৬৩ হাজার বর্গফুট জায়গায় আমদানি-রপ্তানি কার্গো কমপ্লেক্স, ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার সব মিলিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দরে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে থার্ড টার্মিনালে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত