নামকরা উৎপাদক ও সুপরিচিতি দোকানের খাবারের প্রতি মানুষের বেশ আগ্রহ দেখা যায়। আগ্রহের পণ্যটির চাহিদা মেটাতে ক্রেতারা অনেক সময় খাদ্যমানের চেয়ে ‘ব্র্যান্ডে’ বেশি আস্থা রাখেন। আর পণ্যের মোড়কে ‘হোমমেইড’ স্টিকার দেওয়া থাকলে ভোজনরসিকরা অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের একই পণ্যের চেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। দাম একটু বেশি হলেও কেনেন। ক্রেতাদের এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক বিক্রেতা রাতারাতি চড়া মুনাফার দিকে ঝুঁকে পড়েন। যে পণ্যে দুধ নির্দিষ্ট পরিমাণ থাকার কথা, অনেক ক্ষেত্রে তাতে আদৌ দুধ থাকে না। আবার যে উপাদান থাকারই কথা নয়, তার উপস্থিতি পাওয়া যায়। এভাবে অনেক বিক্রেতা গছিয়ে দেন যেনতেন উপায়ে তৈরি খাবার ও খাদ্যপণ্য, যা মারাত্মক স্বাস্থ্য-ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশ রূপান্তরে বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাম্প্রতিক পরীক্ষায় অধিক মুনাফার জন্য যেনতেন উপায়ে পণ্য তৈরি করে মানুষ ঠকানোর এ প্রবণতা আবার উঠে এসেছে।
সব ঘি দুধ থেকে তৈরি এমন ধারণা ক্রেতাদের। কিন্তু কিছু ঘিতে সেই দুধই থাকে না, এমন প্রমাণ মিলেছে ডিএসসিসির পরীক্ষায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রেতারা রাজধানীর খিলগাঁওয়ের একটি বেশ চালু দোকান থেকে ‘খিরসা-ঘি’ কিনে থাকেন। ঘিতে দুগ্ধ-চর্বির ন্যূনতম মান ৯৯ দশমিক ৭০ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু এই ঘিয়ের পুরোটাই পাম ওয়েলের সঙ্গে ঘিয়ের কৃত্রিম ঘ্রাণ ও সুগন্ধি মিশিয়ে তৈরি। অমøতা থাকার কথা ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৮৫ শতাংশ। অন্যান্য উপাদানও নির্ধারিত মানে না পাওয়ায় আইন অনুযায়ী মামলা হয়েছে। মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরওয়ানাও জারি হয়েছে। তার দাবি, তিনি যে প্রতিষ্ঠান থেকে ঘি কেনেন, তাদের ঘি বিএসটিআই অনুমোদিত। তাহলে বিএসটিআই কী দেখে ‘অনুমোদন’ দিল? আর এই অনুমোদন আসল না নকল, তা খতিয়ে দেখার প্রশ্নও সামনে চলে আসে। এমন প্রতিষ্ঠান বা পণ্য যে কেবল একটি, তা নয়। সারা দেশে এমন খাদ্যপণ্য উৎপাদক ও বিক্রির দোকান বিস্তর। বৈদ্যুতিক ওভেন সজ্জিত বেকারি এখন পাড়ায় পাড়ায়। পাউরুটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কেক, বাহারি নামের বিরিয়ানির সঙ্গে বোরহানি- সবই এখন আসে ‘হোম মেইড’ মোড়কে। তাদের অনেকেই পাউরুটিতে ক্ষতিকর পটাশিয়াম ব্রোমেট ব্যবহার করছেন। প্রতিষ্ঠিত রেস্তোরাঁ, দোকান থেকে শুরু করে ‘হোম মেইড’ এই যে সরবরাহব্যবস্থা, তাতে খাবার ও খাদ্যপণ্যের মান ঠিক রাখার কী গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা চালু আছে? একটি চেইন-রেস্তোরাঁর মতিঝিল শাখার ‘শাহী বোরহানি’র নমুনায় দুগ্ধ প্রোটিন পাওয়া গেছে মাত্র ১ দশমিক ৭১ শতাংশ। অথচ থাকার কথা ২ দশমিক ৭১ শতাংশ। ১০ শতাংশ দুগ্ধ চর্বির জায়গায় পাওয়া গেছে মাত্র ২ দশমিক ১১ শতাংশ। নিরাপদ খাদ্য আদালতে মামলা হওয়ার পর মালিক দোষ স্বীকার করেছেন। প্রশ্ন হলো, সারা দেশে গ্রাম, শহর ও নগরজুড়ে রেস্তোরাঁ ও খাদ্যপণ্য সরবরাহকারীদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাস্তবে তদারকি করে থাকে। আর কালেভদ্রে তদারকিতে গেলেও কী ব্যবস্থা নিয়ে থাকে?
পরিস্থিতি যা, তাতে ভেজাল খাবার বন্ধ করা এক দুঃসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে রেহাই পেতে নানামুখী পদক্ষেপ দরকার। সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। প্রয়োজনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আইন বদলাতে হবে। এমন প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা গেলে প্রমাণসাপেক্ষে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দরকার। জরিমানার টাকার তুলনায় মুনাফা অনেক বেশি হয় বলে শুধু জরিমানায় ভেজাল দূর হবে না। মানুষের স্বাস্থ্য-ঝুঁকি নিয়ে যারা খেলা করে, তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠাতে হবে। চীনে শিশুদের গুঁড়াদুধে ভেজাল পাওয়ায় জড়িতদের মৃত্যুদ- হয়েছিল। আমাদের সেই পথে হাঁটতে হবে কি-না, ভাবতে হবে।
