এটিই লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ। গল্পসংখ্যা নয়, ক্রমানুসারে—‘এপিটাফ’, ‘সেলিব্রেটিং সেঞ্চুরি উইথ আদুরী’, ‘অচেনা মানুষ’, ‘সিসিকাস শ্রম’, ‘মাস্টারপিস’, ‘১৯৮০’, ‘ভ্রষ্ট গণক ও বিকলাঙ্গ তাস’, ‘অক্টোবরের শেষ বিকেল’, ‘আগর আলীর প্রাতভ্রমণ’। সিসিফাস নামটি পাঠককে ফরাসি সাহিত্যের বারান্দায় নিয়ে যায়। বোদলেয়ারে নিমগ্ন হতে হতে বুদ্ধদেব নিজস্ব ভাষাভঙ্গিতেও সূক্ষ্ম রূপান্তর এনেছিলেন বোদলেয়ারের অনুগামী হয়ে। অনুরূপ ঝুঁকি ছিল আনিসুরের সামনেও; তবে তিনি তা দক্ষতার সঙ্গে অতিক্রম করেছেন। তার গল্পে পাশ্চাত্যের অনুকরণ নয়, সৃজনশীল আত্মীকরণই মুখ্য হয়ে উঠেছে। যদিও নিজের স্বকীয় শৈলী ও ভাবগত গতিপ্রকৃতি নির্মাণের প্রয়োজনে পশ্চিমের সাহিত্য থেকে তিনি উপাদান নিয়েছেন।
সংজ্ঞার গণ্ডি পেরিয়ে বলা যায়, ছোটগল্প জীবনকে খণ্ডচিত্রে ধারণ করলেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে বিস্তৃত অস্তিত্বের কিংবা অনস্তিত্বের ইঙ্গিত। সীমিত চরিত্র ও সংযত পরিসর সত্ত্বেও এই ধারার গভীরতা কখনো কখনো মহাবিশ্বসম—এক বিন্দুতে অসীমের সংকেত। এই বৈশিষ্ট্যই বর্তমান বইটিতে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এখানে পরিচিত নাগরিক বাস্তবতার আড়ালে উন্মোচিত হয় পরাবাস্তবতা, মানসিক জটিলতা, বিকারগ্রস্ত সত্তা, আবেগ, ভয়, অর্থহীনতা এবং প্রতীকী সংকেতের অস্থির মিশ্রণ। আনিসুরের গল্পে জীবনের বিমূর্ত দিকগুলো যেমন উপস্থিত, তেমনি আছে অচরিতার্থ আকাঙ্ক্ষা ও শূন্যতার দ্বন্দ্ব। স্মৃতি, অবচেতন ও অস্তিত্বসংকটের ভারে একদিকে মানুষ নুয়ে পড়ে, অন্যদিকে বাস্তব ও অবান্তরের সীমান্তে থাকে দোদুল্যমান। গ্রন্থটির স্বল্প আয়তনে ধরা পড়েছে বৃহৎ মানসিক ও দার্শনিক বাস্তবতা।
‘এপিটাফ’ গল্পের শুরুতেই মৃত্যু ও অস্তিত্বের এক পরাবাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে : ‘জন্মের পঁচিশতম বছরে আমি মরে গেলাম। কিন্তু পরবর্তী দশ বছর পর্যন্ত আমার সৎকার হয়নি। আমিই শুধু জেনেছিলাম যে মরে গেছি। মৃত্যুর পরেও এমন তরতাজা শরীর আমাকে হতাশ করে তুলেছিল। কারণ, বিবেকহীন পেটটা তখনো খেয়ে যাচ্ছিল, পা দুটো মাথায় নিয়ে ঘুরছিল একটা আস্ত শরীর।’ মৃত্যুর পরেও শরীরের ‘জীবিত’ আচরণ মানুষের বিচ্ছিন্ন আত্মসচেতনতার প্রতীক। এখানে আত্মপরিচয় ও বাস্তবতার ভাঙন দেখানো হয়েছে; আর ব্যক্তি তার নিজের অস্তিত্বকেই বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। শরীরের অঙ্গগুলোর অস্বাভাবিক চলাচল মানুষের ভেতরের ভোগবাদী ও অযৌক্তিক জীবনযন্ত্রের ব্যঙ্গাত্মক রূপ মূর্ত করেছে।
‘সেলিব্রেটিং সেঞ্চুরি উইথ আদুরী’ গল্পে আদুরীকে ঘিরে নির্মিত বয়ানে ব্যক্তিগত জীবনগাথার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন ও বিশ্ববাস্তবতার ব্যঞ্জনা। বিভিন্ন ঘটনার ইঙ্গিতধর্মী বিন্যাসে এখানে অন্যায় ও বৈষম্যের সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট হয়। অন্যদিকে ‘মাস্টারপিস’ গল্পেও ব্যক্তি নয়, পরিস্থিতিই মুখ্য শক্তি হিসেবে উপস্থিত। তবু চরিত্র নির্মাণে আনিস তার স্বভাবসুলভ অভিনবত্ব বজায় রেখেছেন। সড়ক দুর্ঘটনার মতো সাধারণ অথচ তীব্র অভিজ্ঞতাকে তিনি ব্যঙ্গ-রসের সূক্ষ্ম আলোয় নতুন তাৎপর্য দিয়েছেন। তাছাড়া, বিকৃত মানবদেহকে শিল্পরূপে দেখানোর যে দৃষ্টিভঙ্গি তিনি নির্মাণ করেছেন, তা তার কল্পনাশক্তি ও শিল্পনৈপুণ্যের শক্তিশালী প্রকাশ।
‘সিসিফাস শ্রম’-এর আফসার মিয়া বাহ্যিক প্রাপ্তিতে পরিপূর্ণ হলেও অতীতের নির্দয় স্মৃতির কাছে পরাজিত, মনের আকাশে সামান্য ঝলক উঠলেই সে সঙ্কুচিত, আতঙ্কিত এক প্রাণী। স্মৃতির বিষাক্ত দংশন ধীরে ধীরে গ্রাস করে তার সত্তা। ‘ভ্রষ্ট গণক ও বিকলাঙ্গ তাস’ গল্পেও স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মতো চরিত্রকে আচ্ছন্ন করে, তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় অন্তর্গত বিস্ফোরণে। এই অভিজ্ঞতা শহরের বহু মানুষের; তারা বিচ্ছিন্ন, একাকী, নিজস্ব অতীতের ভারে নত। লেখক নিজেকেও সেই সারির অংশ করে তোলেন বলেই বয়ান বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। তার চেতনাপ্রবাহের নির্মাণ গভীর ও অন্তরঙ্গ। এগুলো অবলীলায় আমাদের টেনে নিয়ে যায় অবচেতনের ঘোলাটে স্তরে। ‘১৯৮০’ নামের গল্পে সেই সমষ্টিগত, জীর্ণ অথচ বাস্তব মানসিকতার শক্তিশালী রূপায়ণ বিশেষভাবে উজ্জ্বল।
সিসিফাস শ্রম সমকালীন মানব অস্তিত্বের জটিল মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম দলিল। সুকুমার ও সংযত গদ্য, গভীর চেতনাপ্রবাহ ও প্রতীকী নির্মাণে আনিসুর রহমান ক্ষুদ্র পরিসরে বৃহৎ জীবনবোধকে ধরতে পেরেছেন। স্মৃতি, অবচেতন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বে তার চরিত্ররা যেমন ভঙ্গুর, তেমনি সত্যনিষ্ঠ। লেখকের দূরদৃষ্টি ও অসামান্য বয়নভঙ্গি তার সৃজনশীলতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে একরকম বাধ্য করবে পাঠককে।
