গ্রাহকপর্যায়ে বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম

আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ০৭:৩৫ এএম

গ্রাহকপর্যায়ে বাড়তে যাচ্ছে বিদ্যুতের দাম। এ লক্ষ্যে দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির দেওয়া মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর দুই দিনব্যাপী গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে দ্বিতীয় দিনের শুনানি হয়। এতে সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটি। ঈদের পর পরই দাম বাড়ানোর ঘোষণা এবং আগামী জুন থেকে তা কার্যকর হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৪ হাজার ৪৮১ জন। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ১২১ জন। দাম বাড়লে সরাসারি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ৫ কোটি গ্রাহক।

শুনানির শেষ দিনে গতকাল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো), ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং নর্দান ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) দাম বৃদ্ধির ওপর শুনানি হয়। দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় সবটুকু পিডিবি কিনে নেয়। এরপর বিতরণ কোম্পানির কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে পিডিবি। বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তার কাছে বিক্রি করে। শুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশের ভোক্তারা তার পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না, তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যৌক্তিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়, বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লস, বিলম্বিত প্রকল্প, অতিরিক্ত ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো উচিত নয়। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বাড়াবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো জনজীবনে চাপ সৃষ্টি করবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও অপচয় কমিয়ে ব্যয় হ্রাসে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস ও বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করে ভোক্তাবান্ধব ও বাস্তবসম্মত মূল্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে।

শুনানিতে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, সেবা খাত থেকে মুনাফা করার চিন্তা বাদ দিতে হবে। তিনি প্রশ্নে তুলে বলেন, কোন লোকশানি খাত থেকে কর নেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু বিদ্যুতের লোকশানি খাত থেকে কর নেওয়া হচ্ছে। তিনি বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সমর্থন করলেও সরকারি হাসপাতাল, এমন কী স্কুল-কলেজে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবি জানান।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চেয়ে কীভাবে কমানো যায়, সেই আলোচনা করা জরুরি। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মানেই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পকেট কাটার উদ্যোগ।  কমিশনকে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন না করার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

সাংবাদিক শুভ কিবরিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী একদিকে মানুষের জীবন সহজ করতে কার্ড বিতরণ করেছেন। অন্যদিকে মানুষের জীবন কঠিন করতে বিইআরসি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

শুনানিতে সব বিতরণ কোম্পানি তাদের লোকসানের ফিরিস্তি তুলে ধরেছে। চলতি অর্থ বছরের আর মাত্র ৪০ দিন বাকি রয়েছে। বিইআরসি এই সময়ের বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুতের দাম হিসাব করে বলছে এখনকার পাইকারি দামে কিনে বিক্রি করলেও পিডিবির ৮৩ কোটি, আরইবির ৪৪৯ কোটি, ডিপিডিসির ৬৫ কোটি, ডেসকোর ৮৩ কোটি, ওজোপাডিকো এর ৩৩ কোটি এবং নেসকোর ৪১ কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে।

শুনানিতে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুশাহিদা সুলতানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. জেবুন্নেছা, নাগরিক সমাজের মো. মহিউদ্দিন,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেবুন্নেসা, অধ্যাপক মুসাহিদা সুলতানা, স্টিলমিল অ্যাসোসিয়েশনের জাহাঙ্গীর আলম, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির জাকির হোসেন নয়ন, সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফারহান নুরসহ অনেকে বক্তব্য দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত