কাজের চাপ থাকলে প্রায়ই বাসায় না ফিরে কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থেকে যাই। বিকেলে ক্যাম্পাসের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে একটু হাঁটাহাঁটি করি। অনেক সময় পাখি ও বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ করি। ওদের ছবি তুলি। গত বছরের ১৫ অক্টোবর ঢাকায় না ফিরে ক্যাম্পাসে থেকে গেলাম। বিকেল-সন্ধ্যা-রাতভর কাজ করলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা সারার আগেই পাখি-প্রাণীর খোঁজে ক্যামেরা নিয়ে বের হয়ে গেলাম।
চমৎকার রোদেলা সকাল। তেমন একটা গরম না। প্রথমেই বন ও পরিবেশ অনুষদের আমলকী বাগানের দিকে গেলাম। আমলকী গাছে থোকায় থোকায় ফল ধরে আছে। ফল বড় হতে আরও কিছুদিন লাগবে। তবে ড্রাগন ফলগুলো পেকে টকটকে লাল হয়ে আছে। আর তাতে ঠোঁট চালাচ্ছে কয়েকটি কোকিল ও ভাত শালিক। ওদের ছবি তুলে ‘এক্স সিটু জিন ব্যাংক’ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানের দিকে গেলাম। উদ্যানে বটকল, কোকিল, ছোট পানকৌড়ি, কানিবক, শে^তাক্ষী, বুলবুলি, টুনটুনি ও সাদা-কোমর মুনিয়ার দেখা মিলল। উদ্ভিদ উদ্যান থেকে বেরিয়ে খামারের পেছনের গবেষণা ধানক্ষেতের দিকে হাঁটা দিলাম। ধানক্ষেতের সামনে গিয়ে চোখ ছানাবড়া! ধানের পাকা শীষে বসে আছে গোটা দশেক তিলা মুনিয়া। শীষের উপর বসে চমৎকারভাবে একটি একটি করে ধান খুটে খাচ্ছে। অতি সুন্দর সে দৃশ্য! ওদের ছবি তুলে আবারও উদ্ভিদ উদ্যানে ঢুকলাম।
উদ্যানে ঢোকার মুখে কৃত্রিম হ্রদের উপর বানানো সেতুর রেলিংয়ে একটি কানিবককে বসে থাকতে দেখলাম। পাশের একাশিয়া গাছে কিচিরমিচির শব্দ শুনে ওদিকে ক্যামেরা তাক করতেই একাশির হলুদ ফুলে শে^তাক্ষী, লালগলা চটক, বড় গোধুকা ও নীলটুনির দেখা পেলাম। ওদের ছবি তুলে হ্রদের উল্টোদিকে চোখ পড়তেই এক অভাবনীয় দৃশ্য চোখে পড়ল। দুটি সোনালি রঙের শিকারি প্রাণী ওখানে বসে ছিল। হঠাৎ ওদের একটি দাঁড়িয়ে গেল। ও যেভাবে কসরত শুরু করল তা ছিল দেখার মতো। এমন দৃশ্য আগে কখনোই দেখিনি। আমার অনুসন্ধিৎসু চোখ প্রাণীটির চমৎকার কসরত অবলোকন করতে থাকল। আর হাতের আঙুল প্রজাপতির ডানার মতো ব্যস্ত হয়ে উঠল। এমন অভাবনীয় কসরতের ছবি তুলতে পেরে মনের আনন্দে বিভাগের দিকে হাঁটা দিলাম।
কসরতরত প্রাণীটি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণী শিয়াল। শৃগাল বা পাতি শিয়াল নামেও পরিচিত। অবশ্য ধূর্ততা ও চতুরতার জন্য এদেশের অনেকেই ওকে শিয়াল পণ্ডিত বলে থাকেন। শিয়ালের ইংরেজি নাম অংরধঃরপ ঔধপশধষ, এড়ষফবহ ঔধপশধষ বা ঔধপশধষ। কুকুর ও নেকড়ের জাতভাই শিয়াল ক্যানিডি (ঈধহরফধব) গোত্রের সদস্য। বৈজ্ঞানিক নাম ঈধহরং ধঁৎবঁং (ক্যানিস অরিয়াস)। এ দেশের প্রায় সবখানেই ওর দেখা মিলে। বিশ্বব্যাপী এরা উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
চেহারা খানিকটা নেকড়ের মতো হলেও শিয়াল আকারে কুকুরের চেয়ে ছোট। লেজের গোড়া থেকে নাকের ডগা পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক শিয়ালের দৈর্ঘ্য ৬০-৭৫ সেন্টিমিটার। লেজের দৈর্ঘ্য ২০-২৮ সেন্টিমিটার। ঘাড় বরাবর উচ্চতা ৩৫-৪০ সেন্টিমিটার। ওজন ৭-১১ কেজি। মুখ লম্বাটে। লেজ ফোলা ও সব সময় নিচের দিকে নামানো থাকে। দেহের লোম একনজরে গাঢ় বাদামি থেকে সোনালি। দেহের উপরটা কালচে ও নিচটা হালকা বাদামি। মুখমণ্ডলের নিচ থেকে গলা পর্যন্ত সাদাটে।
এরা খোলামেলা এলাকায় বাস করে। দিনের বেলা ঝোপঝাড় বা গর্তে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যায় খাদ্যের অন্বেষণে বের হয়। সচরাচর দলে থাকলেও জোড়ায় বা একাকীও দেখা যায়। বৃষ্টির দিনে ও গর্তে বাচ্চা থাকলে দিনেও খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। মূলত মাংসাশী হলেও এরা সর্বভুক। পাখি, হাঁস-মুরগি, গোসাপ, সাপ, কাঁকড়া, মাছ, ইঁদুর, মরা-পচা প্রাণী, ডাস্টবিনের ময়লা, এমনকি কবর খুঁড়ে মানুষের লাশও খায়। এ ছাড়া ভুট্টা, আখ, তরমুজ, আম-কাঁঠাল, খেজুরের রস ইত্যাদিও খায়। সুযোগ পেলে দল বেঁধে দুর্বল ছাগল-ভেড়া বা তাদের বাচ্চাকে ধরাশায়ী করে। একাকী পেলে মানুষকেও আক্রমণ করতে পারে। তবে কুকুরকে বেশ ভয় পায়। চালাক-চতুর হলেও কিছুটা ভিতু স্বভাবের। ঘ্রাণশক্তি প্রবল; লেজের নিচের গ্রন্থির দুর্গন্ধ দিয়ে শত্রু তাড়ায়।
শিয়াল মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাস করে। বছরে দু’বার বাচ্চা দেয়। স্ত্রী ৫৭-৭০ দিন গর্ভধারণের পর চার থেকে ছয়টি বাচ্চার জন্ম দেয়। প্রায় ১২ দিনে বাচ্চাদের চোখ ফোটে। বাচ্চারা গর্তের বাইরে এসে যখন খেলা করে দেখতে বেশ লাগে। প্রকৃতিতে এরা ১০-১৫ বছর বাঁচতে পারে। বর্তমানে এরা দেশের প্রায় সবখানেই নির্যাতনের শিকার। একটি কথা মনে রাখা উচিত যে, শিয়াল আমাদের শত্রু নয়, বরং পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওরা ভালো থাকলে পরিবেশ ভালো থাকবে, আমরাও ভালো থাকব।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
