সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্লাস। হাতে আইন বিভাগের মোটা মোটা বই, সামনে অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার চাপ। কিন্তু দিন শেষে সন্ধ্যা নামলেই যেন বদলে যায় আরেকটি পৃথিবী। তখন ক্লাসরুমের শিক্ষার্থী জোহরা ইকবাল মিম হয়ে ওঠেন দৌড় ট্র্যাকের এক দুর্দান্ত প্রতিযোগী। দৌড়ের শেষ মুহূর্তে ফিনিশিং লাইনের দিকে তাকিয়ে তার মনে তখন একটাই চিন্তা ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন মা, তাকে জিততেই হবে।
শেষ পর্যন্ত জিতেছেনও। ১৮ মে সোমবারে অনুষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়ন, হল চ্যাম্পিয়ন, সেরা অ্যাথলেট এবং দ্রুততম মানবী হিসেবে স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন আইন ও বিচার বিভাগের ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী জোহরা ইকবাল মিম।
তবে জোহরার গল্প শুধু কয়েকটি পদক জয়ের গল্প নয়। এটি পরিবার, আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম এবং নীরব সমর্থনের গল্পও।
জোহরার ছোটবেলা কেটেছে কুমিল্লায়। পরে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় আসা। নিজেকে তিনি চঞ্চল স্বভাবের মানুষ বলেই পরিচয় দেন। সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন খেলতে। বরফ-পানি, গোল্লাছুট, ক্রিকেট- খেলাধুলা যেন ছিল তার প্রতিদিনের জীবনের অংশ। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহটা এসেছে পরিবার থেকেই। তার মা ছিলেন ভালো অ্যাথলেট, পাশাপাশি ছবি আঁকতেন দারুণ। বাবা ছিলেন সংস্কৃতিমনা মানুষ। শখ করে গানের স্কুলও পরিচালনা করতেন এক সময়। খেলাধুলা আর সাংস্কৃতিক আবহে খুব আনন্দময় একটি শৈশব কেটেছে তার। ছোট থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতেন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে। ব্যত্যয় হয়নি বড় হয়েই। পেয়েছেন পরিবারের সমর্থন। তার কোনো আগ্রহকেই ছোট করে দেখা হয়নি। খেলাধুলা, গান, নাচ সবকিছুকেই নিয়েছিলেন খুব স্বাভাবিকভাবে। এখনো অবসর সময় পেলেই গান করেন, নাচেন। নিজের মতো করে সময় কাটান। অ্যাথলেট হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় সেরার স্বীকৃতি পেলেও খেলাধুলাকে কখনো শুধু প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেননি। বরং এটি তার কাছে নিজেকে ভালো রাখারও একটি জায়গা।
অনেক নারী ক্রীড়াবিদের গল্পে সামাজিক বাধা কিংবা কটূক্তির অভিজ্ঞতা থাকে। তবে জোহরার ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। ‘মেয়েরা খেলাধুলা করে কী হবে’ এ ধরনের মন্তব্য খুব একটা শুনতে হয়নি তাকে। বরং পরিবার এবং আশপাশের মানুষ সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়েও সন্তুষ্ট তিনি। তার ভাষায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের খেলাধুলাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। ‘এখানে নিরাপত্তা আছে, সুযোগ-সুবিধা আছে। এমনকি চ্যাম্পিয়নদের স্বর্ণপদকও দেওয়া হয়,’ বলেন তিনি।
তবে পড়াশোনা আর খেলাধুলা একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়াটা সহজ নয়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্লাস শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়েই কখনো মাঠে যেতে হয়। কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যেও আলাদা এক শান্তি খুঁজে পান জোহরা। আইন বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্তটাও ছিল তার নিজের। খেলাধুলা আর আইনি পেশাকে এক সুতোয় বাঁধার ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে। সুযোগ পেলে স্পোর্টস ল বা খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে তার। মিল খুঁজে পান মাঠ আর আদালতের মধ্যেও। দু-জায়গাতেই যে টিকে থাকতে হলে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগেও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন জোহরা। আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে স্প্রিন্টে রানারআপ হয়েছিলেন। অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন ফেস্টেও। ইন্টার কলেজ সায়েন্স ফেস্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে তার। তবে এবারের বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফাইনাল তার কাছে ভিন্ন। কারণ সেই দৌড়ে জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মায়ের মুখ। সেই অনুভূতি ব্যক্ত করে মিম বলেন, ‘আমি শুধু ভাবছিলাম, ফিনিশিং লাইনের ওপাশে আমার আম্মু দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে জিততেই হবে।’ বিজয়ী হওয়ার খবরটা প্রথম জানান মাকে। মায়ের গর্ব মেশানো ‘সো প্রাউড অব ইউ বাবুমন’ বাক্যটি তাকে সেদিন দিয়েছিল সার্থকতার অনুভূতি।
জোহরার কাছে সাফল্যের সংজ্ঞাটা অন্যরকম। ট্রফি বা পদকের চেয়ে বাবা-মায়ের হাসিমুখই তার কাছে বেশি মূল্যবান। ‘সব কঠিন সময়ে আমি আমার মায়ের মুখটাই ভাবি। এটাই আমাকে শক্তি দেয়, আমার জীবনের সব খুশি আমি বাবা-মাকে দিতে চাই।’ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী জোহরা মনে করেন, বাংলাদেশের নারী ক্রীড়ার সামনে সম্ভাবনার বড় জায়গা তৈরি হচ্ছে। তবে আরও সুযোগ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সমর্থন প্রয়োজন।
আইনের বই, দৌড়ের ট্র্যাক, গান, নাচ আর পরিবারের ভালোবাসা সব মিলিয়ে জোহরার জীবন যেন এক ছন্দময় গল্প। যে গল্পে জয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে বিশ্বাস আর ফিনিশিং লাইনের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকে একজন মা! অ্যাথলেট মা-ই তার এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
