হাটভর্তি গরু বাড়তি দাম বিক্রি কম

 ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থী বেশি

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০৩:১৬ এএম

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী গাবতলী পশুর হাট। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হলেও এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি বেচাকেনা। কোরবানির পশু দেখা, সেলফি তোলা আর দরদামেই সীমাবদ্ধ ক্রেতা-দর্শনার্থীরা। সময় হাতে থাকায় বিক্রেতারা কিছুটা বেশি দাম হাঁকাচ্ছেন। যে কারণে আরও যাচাইয়ের জন্য সময় নিচ্ছেন ক্রেতারা।

রাজধানীর অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটগুলোতে গতকাল রবিবার থেকে আনুষ্ঠানিক বেচাকেনা শুরু হয়েছে। তবে বেচাকেনা ছিল অনেক কম। ইজারাদাররা আশা করছেন এক-দুই দিনের মধ্যেই বেচাকেনা জমে উঠবে।

গোলাপবাগ হাটের ইজারাদার আমির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো হাটে কোরবানির পশু আসছে। তবে যে পরিমাণ বিক্রির আশা করা হয়েছিল, তা হচ্ছে না। লোকজন এসে ঘুরে চলে যাচ্ছেন। আশা করছি এক-দুই দিনের মধ্যে বেচাকেনা বাড়বে। তিনি বলেন, ঢাকার গরু কিনে রাখার জায়গার সংকট এবং পরিচর্যার ঝামেলার কারণে বেশিরভাগ মানুষ সাধারণত শেষ মুহূর্তে গরু কিনেন।

হাটে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, গত কয়েকদিনের তুলনায় এখন দাম বেশি চাচ্ছেন বিক্রেতারা। খামারিরা বলছেন, ঢাকার বাইরে থেকে গরুর আনার খরচ আগের তুলনায় বেশি পড়ছে। গতকাল ঢাকা দক্ষিণ সিটির ডেমরা আমুলিয়া হাট ঘুরে দেখা গেছে, পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে গরু কিনতে এসেছেন ব্যবসায়ী আসলাম। একই হাটে আগের দিনও গরু দেখে গেছেন তিনি। গরুর দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘গতকাল দেখলাম গরুর দাম কম, একই গরু আজ দাম চাচ্ছে বেশি। হাটে এসেছি গরু নেব বলে, কিন্তু এখন দামে মিলছে না।’

ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে দুই কাজিনসহ হাটে এসেছেন তাওহিদুল ইসলাম। তারা ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বছর প্রথমবার হাটে এসেছি। দাম যা দেখলাম, বেশিই মনে হচ্ছে। আজ দামে মিললে নেব, না হলে দুয়েকদিন অপেক্ষা করব।’

খামারিদের অভিযোগ, ঢাকার বাইরে থেকে গরু নিয়ে আসতে বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। মেহেরপুর থেকে হাটে গরু নিয়ে এসেছেন জিয়ারুল হক। আমুলিয়া হাট পর্যন্ত ট্রাকে ১৫টি গরু নিয়ে আসতে খরচ পড়েছে ৪০ হাজার টাকা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাঁচজন মিলে ট্রাকে গরু নিয়ে এসেছি। ভাড়া গতবারের তুলনায় ১০ হাজার টাকা বেশি পড়েছে। গত বছর এই হাটেই ২০টি গরু নিয়ে এসেছিলাম।’

সিরাজগঞ্জ থেকে ছেলে ও মেয়ে জামাইকে সঙ্গে নিয়ে ১০টি গরু হাটে এনেছেন আব্দুল মালেক। এর মধ্যে দুটি গরু বিক্রি হয়েছে। একটি ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা, অন্যটি ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। আব্দুল মালেক দেশ রূপান্তরকে একটি গরু দেখিয়ে বলেন, ‘দুইটা গরু বিক্রি হলো, আর আটটা আছে। এই গরুটা পাঁচ-ছয় মাস আগে কিনেছিলাম ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে, এখন ৩ লাখ ৫০ হাজার হলে ছেড়ে দেব। লাভ একটু কম হবে, তবে সবগুলো বিক্রি হলে টাকা উঠে আসবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে হাটে গরু নিয়ে এসেছেন ব্যাপারী আশরাফুল। নিজের ৬০টিসহ তার পরিচিত ব্যাপারীদের প্রায় ২০০টি গরু আসবে হাটে। এর মধ্যে দুই ট্রাক গরু চলে এসেছে, বাকিগুলো পথে আছে। গরুকে খাবার (ভুসি) দিতে দিতে আশরাফুল বলেন, ‘নিজের কিছু পালিত গরু ছিল। বাকিগুলো এলাকা থেকে কিনেছি। এই কয়েকদিনে ৬টি গরু বিক্রি হয়েছে, আরও গরু আসছে। প্রতি ট্রাকে ১৮টি করে ২০০টির মতো গরু আসবে।’

হাটে দর্শনার্থী ও আগ্রহী ক্রেতা থাকলেও বড় ও বেশি দামের গরু কিনছেন খুব কম মানুষ। অনেকেই বাজার যাচাই করছেন। কেউ দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন। প্রকৃত ক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষি হচ্ছে খুবই কম।

কুষ্টিয়া থেকে গাবতলীর হাটে গরু নিয়ে আসা দুলাল জানান, প্রায় ২৫ মণ ওজনের গরুর দাম চাইছেন ১২ লাখ টাকা। কেউ কেউ দাম করছেন। তবে নেওয়ার মতো দাম এখনো কেউ বলেনি। তিনি বলেন, গরু বড়, অনেকেই দেখতে আসেন। দাম জানতে চান। কিন্তু দামাদামি করছেন খুব কম লোক। খাবারের খরচ ও পরিচর্যায় অনেক ব্যয় হয়েছে, তাই ভালো দাম না পেলে বিক্রি করবেন না বলে জানান তিনি। সরেজমিন হাট ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের মূল আগ্রহ এখন ২০০ থেকে ৩০০ কেজি ওজনের গরুর দিকে। তুলনামূলকভাবে ১ থেকে ৩ লাখ টাকার মধ্যে থাকা গরুগুলোর চাহিদা বেশি।

জয়পুরহাট থেকে ২৭টি গরু নিয়ে পশুর হাটে এসেছেন ব্যবসায়ী আনিসুল ইসলাম। সাড়ে তিন লাখ থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছেন তিনি। ওই গরু দেখে মিরপুরের বাসিন্দা আল আমিন হোসেন জানান, দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। তাই আরও সময় নিয়ে কিনবেন। শেষ দিকে বাস্তবতা বুঝতে পেরে ব্যাপারীরাও দাম কমাবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তেজগাঁও পশুর হাটে নজর কেড়েছে দুই জোড়া উট

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর তেজগাঁও পশুর হাট এখন জমে উঠতে শুরু করেছে। হাটে এবার আলাদাভাবে নজর কেড়েছে দুই জোড়া উট। হাটে সম্মানিত ব্যক্তি বা ভিআইপিদের জন্য আলাদা পশু প্রদর্শন ও বিক্রয় কর্নার রয়েছে। গতকাল রবিবার হাট ঘুরে দেখা গেছে, আলাদা একটি অংশে বড় আকারের গরু, বিদেশি জাতের দুম্বা এবং উট রাখা হয়েছে। ওই এলাকায় প্রবেশ ও দেখভালের জন্য অতিরিক্ত কর্মীও নিয়োজিত রয়েছেন।

হাটসংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি ও বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যেন ভিড়ের মধ্যে না পড়ে স্বাচ্ছন্দ্যে পশু দেখতে পারেন, সেজন্য বিশেষ এই কর্নার করা হয়েছে। সেখানে রাখা পশুগুলোর বেশিরভাগই উচ্চমূল্যের।

এবারের হাটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে উট ও দুম্বা। দূর থেকে এসব পশু দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করছেন।

বেনাপোল থেকে নিয়ে আসা হাটে একটি উটের দাম হাঁকা হচ্ছে ২০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। ব্যবসায়ী নূরনবী খান দেশ রূপান্তরকে জানান, সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির প্রভাব এবং ব্যতিক্রমী কোরবানির আগ্রহ থেকেই ধনাঢ্য ক্রেতাদের মধ্যে উটের চাহিদা বাড়ছে। এই হাটে প্রথমবারের মতো উট ও দুম্বা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে উটগুলো বাংলাদেশি খামারেই লালন-পালন করা হয়েছে। 

তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল খেলার মাঠ ও আশপাশের প্রতিটি রাস্তার দুই পাশে পশুর সারি চোখে পড়েছে। হাটে বড় গরুর দামও বেশ চড়া। মাঝারি গরু ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রির আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। বড় আকৃতির কিছু গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

ক্রেতারা বলছেন, বেচাকেনার চাপ না বাড়লেও ঈদের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই হাট জমে উঠবে। হাট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত আলো, পানির ব্যবস্থা এবং পশুর চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি টিম রাখা হয়েছে হাটে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত