স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন হবে?

আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ০৮:০০ এএম

সীতাকুন্ডের জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে জনমনে কৌতূহলের শেষ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত রবিবার এই বহুল আলোচিত এলাকা পরিদর্শন শেষে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সেই এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করা, সেখানে পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপন, কারাগার নির্মাণসহ সরকারি নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ না করারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সরকারের এসব ঘোষণা কতটা বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বস্ত করলেও যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসা জঙ্গল সলিমপুরের নিম্নআয়ের মানুষ উচ্ছেদ-আতঙ্কে ভুগছেন। তাদের মতে, জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করে সেখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে জঙ্গল সলিমপুর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই আছে বলে দাবি করেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। গতকাল সোমবার বিকেলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প আছে। পুলিশ ও র‌্যাব ফোর্স আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলেই এটি সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া খুব শিগগির আমরা সেখানে উঠান বৈঠক করব।’

আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প উদ্বোধন করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি ছিল ৩১ মে। কিন্তু তার আগেই ক্যাম্পটি গত ২৪ মে গভীর রাতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। র‌্যাবের তথ্যানুযায়ী, সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপ এ হামলা চালিয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিন জঙ্গল সলিমপুর গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা এ প্রতিবেদকের কাছে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলীনগরের এক বাসিন্দা প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঙ্গল সলিমপুরে এসেও গুঁড়িয়ে দেওয়া যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প পরিদর্শন করেননি কেন? কেন তিনি আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেই তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন?

জঙ্গল সলিমপুরের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ২৪ মে রাত ১১টার দিকে আলীনগর এলাকায় রাস্তা কাটা শুরু করে সন্ত্রাসীরা। অনেকেই জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলেও প্রায় দুই ঘণ্টা ঘটনাস্থলে পৌঁছেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য। প্রশাসন এ ঘটনার জন্য ‘সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন ও তার সহযোগীদের দায়ী করে। কিন্তু আলীনগরের বাসিন্দাদের মধ্যে ইয়াসিনের দ্বারা সুবিধাভোগী অনেক। তাদের চোখে ইয়াসিন একজন ‘ভালো মানুষ’।

স্থানীয় সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরে দুটি ‘সন্ত্রাসী’ গ্রুপ আছে। একটির নিয়ন্ত্রণ ইয়াসিনের হাতে। অন্যটি নিয়ন্ত্রণ রোকন মেম্বারের হাতে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে জঙ্গল সলিমপুরে একক আধিপত্য ছিল রোকন মেম্বারের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যায় রোকন মেম্বার ও তার বাহিনী। তবে আত্মগোপনে থেকে রোকন মেম্বার উত্তর জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার আশ্রয়ে থাকার চেষ্টা করছে।

রোকন মেম্বারের এক অনুসারী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করতে ইয়াসিনকে গোপনে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে একটি মহল। কারণ সমবায় সমিতির নামে বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পত্তি দখল করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন ইয়াসিন। তার মধ্যস্থতায় সরকারি অনেক আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং শিল্পপতি জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে বিপুল পরিমাণ খাস জায়গা নামে-বেনামে দখলে নিয়েছেন। পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমি, কারাগারসহ সরকারের নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে সেসব জমি হাতছাড়া হয়ে যাবে। এ জন্য অনেকেই চাইছেন না যে, জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হোক।

জানা গেছে, গত কয়েক দশক ধরে নানা রহস্য ও ভীতি কাজ করলেও, চলতি বছরের শুরুতেই নতুন করে জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে জঙ্গল সলিমপুর। বিশেষ করে গত ১৯ জানুয়ারি র‌্যাবের ওপর সশস্ত্র হামলায় র‌্যাব কর্মকর্তা মোতালেব নিহত হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। ওই ঘটনার পর যৌথ বাহিনী এলাকায় অভিযান শুরু করে। যদিও ওই হত্যা মামলার মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অভিযানের মুখে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের আওতায় এসেছে বলে প্রশাসন দাবি করলেও ২৪ মে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সে দাবিও নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গত রবিবার পরিদর্শনে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এলাকা বা অভয়ারণ্য হিসেবে থাকবে না। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা ‘রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে।’ র‌্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে জঙ্গল সলিমপুরে এখন একদিকে চলছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান, অন্যদিকে এলাকাটিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি।

ভূমি অফিসের তথ্যানুযায়ী, প্রায় তিন হাজার ১০০ একর আয়তনের এ এলাকায় চার দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে। সরকারি খাসজমিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বসতি, দোকান ও মার্কেট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত