বিশ্বকাপের আঙিনায় অস্ট্রিয়া মানেই ফুটবল ইতিহাসের এক হারিয়ে যাওয়া সোনালি অধ্যায়ের গল্প। গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে, বিশেষ করে ১৯৩৪ ও ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে যথাক্রমে চতুর্থ ও তৃতীয় স্থান অর্জন করে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের পরাশক্তি হিসেবে জানান দিয়েছিল দলটি। ১৯৫৪ সালের সেই আসরেই অস্ট্রিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৭-৫ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গোলের থ্রিলার ম্যাচ উপহার দিয়েছিল। কিন্তু সেই সোনালি প্রজন্মের বিদায়ের পর অস্ট্রিয়ান ফুটবলের গল্পটা কেবলই আক্ষেপ, অপেক্ষা আর বাছাই পর্বের দেয়াল টপকাতে না পারার ব্যর্থতা।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের পর দীর্ঘ ২৮ বছর বিশ্বমঞ্চের মূল আসরে দেখা যায়নি অস্ট্রিয়াকে। এই দীর্ঘ খরা কাটিয়ে অবশেষে উত্তর আমেরিকার (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) মাটিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরো ২০২০ এবং ইউরো ২০২৪ টানা দুই আসরেই শেষ ১৬-তে জায়গা করে নিয়ে অস্ট্রিয়া জানান দিয়েছিল, তারা বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এবার পুরুষ দলের পালা; প্রায় তিন দশক পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে অতীতের সব আক্ষেপ ধুয়ে-মুছে নিজেদের নতুন করে চেনানোর লক্ষ্যেই মাঠে নামবে অস্ট্রিয়া।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাক্কালে অস্ট্রিয়া ফুটবল দল বর্তমানে এক গোছানো ও লড়াকু ফর্মে রয়েছে। ইউরোতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতার সুবাদে তারা বর্তমানে ফিফা র্যাংকিংয়ের ২৪ নম্বর স্থানটি দখল করে আছে। দলটিতে বিশ্বমানের অভিজ্ঞ তারকা এবং একঝাঁক কঠোর পরিশ্রমী ফুটবলারের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটেছে, যা তাদের এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ‘ডার্ক হর্স’ বা চমক জাগানো দলে পরিণত করেছে।
রালফ রাংনিকের দর্শন
২০২২ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়ার পর অস্ট্রিয়ার ফুটবল দর্শন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন অভিজ্ঞ জার্মান কোচ রালফ রাংনিক। ফুটবলের আধুনিক কৌশল ‘গেগেনপ্রেসিং’ (বল হারানোর পর পরই প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হয়ে বল কেড়ে নেওয়া)-এর অন্যতম জনক বলা হয় তাকে। রাংনিক অস্ট্রিয়া দলে সেই অতি-আক্রমণাত্মক ও গতিশীল প্রেসিং ফুটবল ঘরানা প্রবর্তন করেছেন। তার কৌশলে রক্ষণাত্মক ফুটবল বলে কিছু নেই; মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের ফুটবলারদের অনবরত দৌড়ে প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখা এবং বিদ্যুৎগতির কাউন্টার অ্যাটাকে গোল বের করাই রাংনিকের মূল দর্শন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইউরোপিয়ান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ তাকে কোচ করার জন্য বড় প্রস্তাব দিলেও অস্ট্রিয়া জাতীয় দলের প্রতি অনুগত থেকে তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। রাংনিকের এই ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলার ওপর ভর করেই ২৮ বছর পর বিশ্বকাপ স্বপ্ন সত্যি হয়েছে অস্ট্রিয়ানদের।
মূল ভরসা আলাবা ও সাবিতজার
বর্তমান অস্ট্রিয়া দলের ডিফেন্স ও মানসিক শক্তির মূল স্তম্ভ রিয়াল মাদ্রিদের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ও অধিনায়ক ডেভিড আলাবা। চোট কাটিয়ে দলের রক্ষণের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠার মূল ভরসা তিনি। মাঝমাঠে অস্ট্রিয়ার আসল ‘ইঞ্জিন’ হলেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের তারকা মিডফিল্ডার মার্সেল সাবিতজার। পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রাখা, প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করা এবং খেলা পরিচালনার মূল দায়িত্ব থাকবে তার কাঁধেই। আক্রমণভাগে স্পিড ও অভিজ্ঞতার রসদ জোগাচ্ছেন রেড স্টারের তারকা ফরোয়ার্ড মার্কো আরনাউতোভিচ। এ ছাড়া মাঝমাঠ ও উইংয়ে দলটিকে দারুণ গতি দিচ্ছেন একঝাঁক প্রতিভাবান ফুটবলার, যারা রাংনিকের হাই-প্রেসিং ফুটবলকে মাঠে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন।