৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:৫৩ এএম

তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ব্যাংকগুলোর মোট শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাস আগে এ হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ ১-এর নীতি শাখার সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা শ্রেণিকৃত বা সমস্যাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ দশমিক ৫০ কোটি টাকা। একই সময়ে শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়েছে ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

এক বছর আগের চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা : মার্চ শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। তিন মাস আগে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১ শতাংশ।

নিট শ্রেণিকৃত ঋণও বেড়েছে : ব্যাংকগুলো যে প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে এবং স্থগিত সুদ সমন্বয়ের পর নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ০১ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। ব্যাংকের ধরন ভেদে শ্রেণিকৃত ঋণের হার সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। মার্চ শেষে এসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ হার ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। তিন মাস আগের তুলনায় সব ধরনের

ব্যাংকেই শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকে, ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি কম : মার্চ ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ এই এক বছরে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। তাদের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৭২ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে কম, মাত্র শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ বিতরণের তুলনায় পুরনো ঋণ আদায়ে দুর্বলতা, বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহ এবং ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতির কারণে খেলাপি ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা, মূলধন সক্ষমতা ও নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ড. মাশরুর রিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণ ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ তাদের মতে, ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সুশাসনের ঘাটতি, দুর্বল তদারকি এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। তার মতে, খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা, ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি জোরদারের গুরুত্বারোপ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত