অপরাধ ও অনুপ্রবেশে হত্যা ‘বর্ডার কিলিং’ বলা যাবে না

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ এএম

সীমান্তে অপরাধে জড়িত ও অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে হত্যাকে ‘বর্ডার কিলিং’ বলা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

বিএসএফ ও বিজিবির ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে কোন কোন বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিজি পর্যায়ের যে মিটিংটা হবে, সেটি আমাদের সবসময়ের রেগুলার ফাংশন, প্রতি বছরই হয়। একবার এই সাইডে হয়, আরেকবার ওই সাইডে হয়। এ ক্ষেত্রে বর্ডারের ইস্যুগুলো অ্যাড্রেস করা হবে, উভয় পক্ষের কী কী সমস্যা আছে এবং সমস্যাগুলো কীভাবে হয়, সেসব বিষয়ে কথা হবে। সংশ্লিষ্ট সব বিষয় উত্থাপিত হবে।

সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, আপনারা যেটাকে বর্ডার কিলিং (সীমান্ত হত্যা) বলছেন, সে সম্পর্কে যদি বিস্তারিত জানেন তাহলে খুশি হব। যদি অন্য দেশের বাহিনী কর্তৃক আমাদের সীমান্তে অথবা জিরো লাইনে এসে কিলিং করে, সেটিকে আমরা বর্ডার কিলিং বলতে পারি। কিন্তু যদি আমাদের সীমানার অভ্যন্তরে এবং তাদের সীমানার অভ্যন্তরে কোনো রকমের কোনো অপরাধে কেউ জড়িত থাকে, যদি কেউ ইললিগ্যাল ট্রেসপাস (অনুপ্রবেশ) করে যায়, সেটা তারা (সীমান্তরক্ষী বাহিনী) কীভাবে অ্যাড্রেস করবে তা তাদের দেশীয় আইনের ওপর নির্ভর করে। এটাকে বর্ডার কিলিং বলা ঠিক হবে না।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা ‘বাংলাদেশি’ নাম দিয়ে সীমান্তে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জড়ো করছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা এগুলো শুনতে পাচ্ছি, বর্ডারে বিজিবি অ্যালার্ট আছে। আমরা যেকোনো রকমের ইললিগ্যাল পুশইন বা পুশব্যাকের বিপক্ষে। কিন্তু যদি বাংলাদেশের কোনো সিটিজেন যেকোনো কারণেই হোক সে দেশে গিয়ে থাকে, তাদের যদি ন্যাশনাল আইডি আইডেন্টিফিকেশন ভেরিফিকেশন করা হয়, ন্যাশনাল আইডি ভেরিফিকেশন করে যদি কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে সে রকম কোনো তালিকা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেরণ করে, তারা সেটা আইনানুগভাবে রিপেট্রিয়েশন প্রসেসটা ফলো করবে। সে রকম কোনো বিষয় আমাদের কাছে এখনো পর্যন্ত পেন্ডিং নেই, যদি অতীতে পেন্ডিং থাকে সেটি অবশ্যই সেভাবে লিগ্যালি অ্যাড্রেস করা হবে।

 পোস্টমর্টেম না হলে সুবিধা নেয় আসামিরা : ঢাকার মগবাজারে আদ্-দ্বীন জেনারেল হাসপাতালে মারা যাওয়া ছয় নবজাতককে পোস্টমর্টেম ছাড়া দাফন করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পোস্টমর্টেম ছাড়া মামলায় বিচারকার্যের একপর্যায়ে এটির সুবিধা আসামিপক্ষ পায়। গার্ডিয়ানদের উচিত যেন পোস্টমর্টেমটা করিয়ে নেয়। যদি কেউ পোস্টমর্টেম ছাড়া দাফন করতে চায় সে জন্য একটা প্রক্রিয়া আছে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হয়। এগুলো করে যদি দাফন করে থাকেন, তাহলে ভালো। অন্যথায় যেকোনো সময় মরদেহ উত্তোলন করেও পোস্টমর্টেম করা যায়। সেটা বাদীপক্ষের গার্ডিয়ানদেরই উদ্যোগ নিতে হবে।

 মোহাম্মদপুরকে বলা হয় ঢাকার জঙ্গল সলিমপুর : রাজধানীর অপরাধপ্রবণ মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ে সরকার পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে এবং এই এলাকা বিশেষ নজরে থাকার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মোহাম্মদপুরকে বলা হয় ঢাকার ‘জঙ্গল সলিমপুর’। ঢাকার মধ্যে থাকার পরও আপনারা কেন এখানে মনোযোগ দিতে পারছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের এ সমস্যাটা কি আজকে উদ্ভব হয়েছে? এটা দীর্ঘদিনের একটা পুঞ্জীভূত সমস্যা। ওই এলাকাটি এখন অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, একটু সময় লাগবে। কারণ ওভারনাইট এটা নির্মূল করা হয়তো সম্ভব হবে না, কিন্তু আমরা পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছি। ওই এলাকার জন্য আমাদের একটা বিশেষ নজর আছে।’ মোহাম্মদপুরে ঘনবসতি এবং অধিবাসীদের মধ্যে অনেকেই... আমি এটা ব্লেম করতে চাই না, ওখানে মাদকের বিস্তারও বেশি। তা আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনেও সংস্কার করছি। সামনে দেখতে পাবেন। আর জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং এগুলোর জন্যও আলাদা আইন নিয়ে আসছি। কারণ অপরাধীদের ধরার পর খুব বেশি দিন আটকে রাখা যাচ্ছে না ওই আইনের কারণে। সুতরাং এটা যুগোপযোগী আইন করা দরকার।

সংক্ষিপ্ত সময়ে রামিসা হত্যা মামলার রায় হবে : শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারের সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি এ মামলায় ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। বাকি সাক্ষ্যগ্রহণ হবে। বিচারাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা, আলোচনা করা সঠিক নয়। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে যে সহযোগিতা, তদন্তকারী কর্মকর্তা, সাক্ষীদের নিয়ে যাওয়া, সাক্ষ্যগ্রহণ করানো এগুলো আমরা করাচ্ছি। বাকিটা বিচারকের ফাংশন এবং বিচারকার্য নিয়ে আমরা কথা বলতে চাই না। যেহেতু সবার প্রত্যাশা যে, সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই বিচারকার্য শেষ হোক, আমরা সেটি করার ব্যবস্থা করছি। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে কিছু আইনানুগ ব্যবস্থা আছে, যেমন আসামিকে সাক্ষ্যগ্রহণের পর পড়ে শোনাতে হয়, সেসব বিষয় আছে। তারপর আর্গুমেন্টের জন্য দিন রাখতে হয়। আর্গুমেন্টের পর রায়ের জন্য দিন ধার্য হবে এটা আদালতের বিষয়। আশা করছি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে বিচারকার্য শেষ হবে। রায় কী হবে, কখন হবে এসব আদালতের বিষয়।

ট্রাফিকে শৃঙ্খলা আসছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঢাকার ট্রাফিক সিস্টেমের ক্ষেত্রে যদি বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলি, খুব বেশি বলা হবে না। এখানে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত পরিশ্রম করেছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের ট্রাফিক বিভাগ, পুলিশ এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের এখানে কাজে লাগিয়েছি। আশা করি আমরা একেবারে নিজস্বভাবে এ প্রযুক্তিটা ব্যবহার করে সফলতা পাব। এ ক্ষেত্রে আমাদের জনবল প্রশিক্ষিত আছে। আমরা এখন ট্রায়াল অ্যান্ড এরর বেসিসে এ ট্রাফিক সিস্টেমের উন্নয়নের জন্য কাজ করছি। আশা করি আগামী ১-২ মাসের মধ্যে অন্তত ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিস্টেমে আমরা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারব। ঢাকার বাইরে নতুন এ ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু হবে কি না এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা আগে ঢাকায় কতটা সফলভাবে কি করতে পারি এক্সপেরিমেন্টটা করে অবশ্যই অন্যান্য সিটি করপোরেশনগুলোতে, মেট্রো এরিয়ায় ব্যবস্থা নেব।  রাস্তায় এআই ট্রাফিক ব্যবস্থা, সেই রাস্তায় আবার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও চলছে। এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের দেশে ওভারনাইট হাজার হাজার এ রকম টমটম বা অটোরিকশা রাস্তায় নেমে গেছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় তারা চেষ্টা করেছিল। হাজার হাজার লোকজন যেহেতু, আমাদের এখানে বেকার সমস্যা বেশি, তারা কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে কিছুটা রিলিজ করতে চেষ্টা করেছে। আমরাও সেটা অ্যাড্রেস করেছি। এখন তাদের পুনর্বাসন না করে, যদি আমরা হাজার হাজার লোককে ওভারনাইট বেকার করে দিই, এটিও একটা সমস্যার সৃষ্টি করবে। সে জন্য আমরা চেষ্টা করছি তাদের যাতে শহরের বাইরে অন্যভাবে প্রোভাইড করা যায়, বেকারত্বও সৃষ্টি না হয় আর আমাদের ট্রাফিকের জন্যও কোনো সমস্যা না হয়। 

জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে পরিকল্পনা গোপন রাখলেন : জঙ্গল সলিমপুরে কোনো বিশেষ অভিযানের নির্দেশনা দেবেন কি না এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের পরিকল্পনাটা এখনো ফাঁস করতে চাচ্ছি না। কারণ এগুলো তথ্যফাঁস হলে পরে এসব রেসকিউ অভিযান একুটু অসুবিধা হয়। জঙ্গল সলিমপুরে যারা অধিবাসী আছে, তারা যেকোনো কারণেই হোক সরকারি খাস জায়গায় বসতি স্থাপন করেছে দীর্ঘদিন ধরে। আমরা বলেছি, তাদের উচ্ছেদ করব না। যদি কখনো প্রয়োজন হয়, সেই জায়গায় সরকারি স্থাপনা হয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যায়, তখন পুনর্বাসন করা হবে, সেটা আমরা ঘোষণা দিয়ে এসেছি। আমরা কাউকে উচ্ছেদ করব না। তবে ওখানে সন্ত্রাসীদের কোনো আস্তানা আমরা রাখব না। এটা নির্মূল করা হবে। সে জন্য একটু সময়ের দরকার, আমাদের কিছু কৌশল আছে, সেগুলো সব এখানে বলা ঠিক হবে না।

শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অনেকেই জামিনে ছাড়া পেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা ক্ষুদ্র সন্ত্রাসী বলতে কিছু নেই। যদি অভিযুক্ত ও অপরাধী হয়, তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করব আইনানুগভাবে। জামিন দেওয়ার এখতিয়ার তো আদালতের। আদালত আদালতের কাজ করেছে, আমরা আমাদের কাজ করব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত