মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদকে শেষ বিদায় জানাতে গতকাল মঙ্গলবার ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সেখানে দুপুর আড়াইটায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় তার জন্মস্থান সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদীর কোড়ালিয়া গ্রামের বাড়িতে। সেখানে তৃতীয় জানাজা শেষে মা-বাবা ও স্ত্রীর কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন তোফায়েল আহমেদ। তবে পারিবারিকভাবে সংসদ ভবন ও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর আগ্রহ থাকলেও সেই সুযোগ হয়নি।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টার ভোলা হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। সেখানে আগে থেকেই তার অনুসারী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় উপস্থিত স্বজনদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তোফায়েল আহমেদের মেয়ে ডা. তাসলিমা জামান মুন্নি।
এদিন জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই জেলার সাত উপজেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ স্কুল মাঠে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মাঠ, আশপাশের সড়ক ও জনপদ মানুষে পূর্ণ হয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, অনেকের কণ্ঠে ছিল স্মৃতিচারণ। পুরো ভোলা যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল শোক মিছিলে।
জানাজায় আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী নেতারা ও বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে এই বর্ষীয়ান নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। জানাজার আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বিপুল জনসমাগমের কারণে শুরু থেকেই প্রশাসন ও আয়োজকদের মধ্যে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।
জানাজার আগে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর এবং তোফায়েল আহমেদের মেয়ের জামাই ডা. তোহিদুজ্জামান তুহিন। প্রশাসক গোলাম নবী গভীর শোক প্রকাশ করে মরহুমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং তার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। নিহতের পরিবারের পক্ষে সবার কাছে দোয়া চান জামাতা ডা. তুহিন।
পরে তোফায়েল আহমেদের ভাগনে আশরাফুজ্জামান রাজিব বলেন, ‘শুধু আমরা এতিম হইনি, অভিভাবক হারা হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।’ ভোলা পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র ছালাউদ্দিন লিংকন বলেন, ‘জাতীয় নেতার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের অনেক ক্ষতি হয় গেল।’
এর আগে মরহুমের কফিনে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রতিনিধি দল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
গত সোমবার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তোফায়েল আহমেদ। পরে বাদ মাগরিব ধানম-ির তাকওয়া মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তার মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক মন্ত্রী, বিশিষ্টজন এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। প্রবীণ এ রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব এক বিবৃতিতে বলেন, ‘রাজনৈতিক সংগ্রামের বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমরা একসঙ্গে পথ চলেছি। তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমি উপলব্ধি করেছি তিনি ছিলেন সাহসী, দূরদর্শী এবং জনগণের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতাসম্পন্ন একজন রাজনৈতিক সংগঠক। গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হয়ে থাকবে বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন এক বার্তায় গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘তোফায়েল ভাইয়ের স্মৃতি চির জাগরূক থাকবে বাংলাদেশের অস্তিত্বে।’ জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির শোকবার্তায় বলা হয়, ‘দেশ ও জাতির প্রতি অবদানের জন্য তোফায়েল আহমেদ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
শোক প্রকাশ করে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী এক বার্তায় বলেন, ‘তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।’ প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। শোকবার্তায় তারা বলেন, ‘তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তি পুরুষ। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও অসামান্য অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তার মৃত্যুতে দেশ একজন অভিজ্ঞ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক অভিভাবককে হারাল।’
এক শোকবার্তায় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।’ শোক প্রকাশ করেছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিত্রয় ঊষাতন তালুকদার, নিমচন্দ্র ভৌমিক ও নির্মল রোজারিও এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ।
