ট্রাম্পের সফলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৭:২০ এএম

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনায় বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কিন্তু সে আলাপ চলাকালেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিমুখী আক্রমণের মুখে পড়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ দেশ ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো। অঞ্চলটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনাগুলোয় ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, হামলা-পাল্টা হামলা চলছেই। গতকাল রবিবার ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের শততম দিন। তবে সংঘাত নিরসনে স্থায়ী শান্তিচুক্তি এখনো দূরের বাতিঘর হয়েই আছে। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে যুদ্ধের মূল কলকাঠি নাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফলতা নিয়ে।

যুদ্ধের ১০০ দিনে বদলে গিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ। এই যুদ্ধের জেরে একদিকে নিহত হয়েছেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, তেমনই বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। কারণ যুদ্ধবিরতি ঘোষিত ও কার্যকর হলেও, সেখানকার থমথমে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় প্রশ্ন, যে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছিলেন, তা আদতে কতটুকু সফল হয়েছে? যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ ভোটার মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জয় পেয়েছে। মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, এটা এখন মোটামুটি স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্রের খুব কম নাগরিকই মনে করেন যে ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধে তাদের কোনো লাভ হচ্ছে না। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বারবার করা বিজয়ের দাবির ওপর জনগণ পুরোপুরি আস্থা রাখছে না।

জনসমর্থনের এই ঘাটতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যুদ্ধ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ নিজ দেশে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা করছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। তারা সফল হলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বাকি সময়ের রাজনৈতিক কর্মসূচির বড় অংশই বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ দেখা গেছে খোদ ট্রাম্পের রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও। দলের অনেক নেতাকর্মীই মনে করেন, ইরানে যুদ্ধ করা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান ভোটারদের ৩৩ শতাংশসহ মোট ভোটারের বেশির ভাগ মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলেছে। অন্যদিকে জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব নেতিবাচকের তুলনায় ইতিবাচক বেশি। শিবলি তেলহামির কাছে জরিপের এই ফলাফল ‘বিস্ময়কর’। তিনি বলেন, ‘রিপাবলিকানদের মধ্যেও এখন এই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বয়স্ক ও তরুণ উভয় বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যেই এই মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এটি ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি স্থবির হয়ে পড়েছে। যুদ্ধপূর্বকালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি থেকে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তেলজাত পণ্য সরবরাহ করা হয়, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। তবে তেহরান হরমুজে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারির পর ইরানি বন্দরগুলোতে পাল্টা নৌ-অবরোধ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাপক মাত্রায় ব্যাহত হওয়ায় দাম বেড়েছে জ্বালানির, বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে তারা এখন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বেশ সচেতন হয়ে উঠছেন। গত মাসে আইজিএ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্প যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তা সমর্থন করেন না; এদের মধ্যে ২১ শতাংশ ছিলেন রিপাবলিকান। মাত্র ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নিরাপদ করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৯ শতাংশ ভোটার বলেছেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত