চট্টগ্রাম মহানগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় চামড়ার আড়ত এবং গুদামগুলোতে এখন বিক্রির জন্য প্রস্তুত চার লাখ ১১ হাজার পশুর চামড়া। এসব চামড়া নিয়ে এখন রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ট্যানারির লোকজনের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবাসায়ীরা।
কোরবানির আগে প্রতি বছরের মতো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে লবণজাত চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মনিটরিং না থাকায় এবারও চামড়ার ন্যায্য দাম মিলবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে এখানকার চামড়ার আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম নগরীর আতুরার ডিপো এলাকায় রয়েছে অনেক চামড়ার আড়ত ও গুদাম। সেখানে লবণজাত চামড়াগুলো শুকিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে থরে থরে। কোরবানির পর রক্ত-মাংসের পঁচা গন্ধে এসব গুদামে নিঃশ^াস নেওয়া কষ্টকর ছিল। কিন্তু এক সপ্তাহ পর লবণজাত চামড়াগুলো শুকানোর পর এখন আর সেই অবস্থা নেই। স্থান সংকটের কারণে রাস্তার ওপর লবণ দেওয়া চামড়াগুলোও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন গুদামে। বিভিন্ন গুদাম ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতাদের যাচাই-বাছাইয়ের সুবিধার জন্য চামড়াগুলো আকারভেদে আলাদা আলাদা স্তূপাকারে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, এবার কোরবানির মৌসুমে চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলা মিলে মোট চার লাখ ১১ হাজার ৪৪০ পিস বিভিন্ন ধরনের কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭১০ পিস গরুর চামড়া, ১১ হাজার ৯৫০ পিস মহিষের চামড়া এবং ৫৩ হাজার ৮০০ পিস ছাগলের চামড়া রয়েছে। চামড়াগুলো সংগ্রহের পরপর বিভিন্ন গুদামে লবণজাত করা হয়েছে। সব চামড়া এখন বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
তবে লবণজাত এসব চামড়ার সরকার নির্ধারিত দরে বিক্রি করতে পারবে কি না এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। আবদুস সালাম নামে একজন আড়তদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, লবণজাত চামড়া বিক্রির জন্য চট্টগ্রামে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এখানকার ব্যবসায়ীরা এখন ঢাকার ট্যানারি মালিকদের হাতে অনেকটা জিম্মি। তাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে আমাদের চামড়া বেচাকেনা। সরকার চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিলেও ট্যানারি মালিকরা সে অনুযায়ী দাম দেন না। প্রতি ফুট চামড়ায় অন্তত ১৫ থেকে ২০ টাকা কম দেয়। আর তাদের দেওয়া দরেই আমরা চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হই।
ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় চট্টগ্রামে একসঙ্গে ২২টি ট্যানারি ছিল। কোরবানির মৌসুমে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আড়তে সংগৃহীত চামড়া কিনতে অনেকটা প্রতিযোগিতা চলত এসব ট্যানারির মধ্যে। ব্যবসায়ীরাও তখন ন্যায্য দাম পেতেন। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স পূরণে ব্যর্থতা, কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের আধুনিক অবকাঠামোর অভাব ও আর্থিক সংকটের কারণে একে একে ২১টি ট্যানারি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে একটি মাত্র ট্যানারি রিফ লেদার লিমিটেড রয়েছে চট্টগ্রামে। সারা বছর মিলে মাত্র এক লাখ চামড়া সংগ্রহের সক্ষমতা রয়েছে এই ট্যানারির। যে কারণে কোরবানির মৌসুমে চামড়া বিক্রির জন্য ব্যবসায়ীদের তাকিয়ে থাকতে হয় ঢাকার ট্যানারিগুলোর দিকে।
চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি রিফ লেদারের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড সেলস) মোখলেসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সারা বছরই চামড়া সংগ্রহ করে থাকি। তবে আমাদের টার্গেটের বড় অংশ আসে কোরবানির সময়। বরাবরের মতো এবারও এক লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা আমাদের রয়েছে। তিনি বলেন, একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমরা চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করি। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গ থেকেও চামড়া সংগ্রহ করা হয়। গুণগত দিক দিয়ে উত্তরবঙ্গের চামড়াগুলো ভালো। যে কারণে সেখানকার চামড়ার দামও বেশি।
চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলায় বিভিন্ন গুদামে লবণ মেখে রাখা পশুর চামড়াগুলো এখন বিক্রির জন্য তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ট্যানারি এসব চামড়া নিয়ে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত করবে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ক্রেতা চামড়া কিনতে আসেনি। আমরা ঢাকার বিভিন্ন ট্যানারির লোকজনের জন্য অপেক্ষা করছি। প্রতি বছরই কোরবানির সপ্তাহ-১০ দিন পর বিভিন্ন ট্যানারির প্রতিনিধিরা আসেন। তারা চামড়া দেখেশুনে দাম করে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী চামড়া কিনে নেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, কোরবানির আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে লবণজাত চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা সে অনুযায়ী দাম পান না। ট্যানারির প্রতিনিধিরাও সরকার নির্ধারিত সেই দামের কোনো তোয়াক্কা করেন না। সরকার দর নির্ধারণ করে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। সরকারের নির্দেশনা আদৌ মানা হচ্ছে কি না সেটার কোনো মনিটরিং হয় না। যে কারণে আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়।