বাণিজ্য হবে ৩ হাজার কোটি টাকার

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৮:১০ এএম

আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘আম অর্থনীতি’ এখন বেশ চাঙ্গা। মৌসুমের শুরুতেই আমের বেচাকেনা ও গত বছরের হিসাব অনুযায়ী এবার বাণিজ্য হবে ৩ হাজার কোটিরও বেশি টাকার। এর সঙ্গে শ্রমিক, ঝুড়ি, পরিবহন ব্যবসা হবে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বছরজুড়েই আমকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চললেও মূল বাণিজ্য চলবে তিন মাস। তাই এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন, এখানকার আম চাষি, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। চলছে আমের মহোৎসব। 

মাটি, আবহাওয়া ও প্রকৃতিগত কারণেই সুস্বাদু ও রসালো আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ। দেশ বিভাগের আগে এই খ্যাতি ছিল ভারতের মালদহ জেলার। সুস্বাদু জাতের আম উৎপাদন করে লাভজনক হওয়ায় কৃষকরাও দিন দিন আম চাষ বাড়িয়েছেন। বিগত ১ দশকে আম বাগান বৃদ্ধি পেয়েছে রেকর্ড পরিমাণে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০০৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বাগানের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর। এখন দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর। অর্থাৎ ১১ বছরে বেড়েছে প্রায় ২১ হাজার হেক্টর। প্রায় ৮২ লাখ গাছ থেকে আম উৎপাদিত হচ্ছে। এসব গাছ থেকে গুটি, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত/হিমসাগর, ফজলি, ল্যাংড়া, আশ্বিনা, আম্রপলি, গৌড়মতি, সুরমা, রানী পছন্দ, মল্লিকা, বোম্বাই, কাঁচামিঠা, টিক্কা ফরাস, কালিভোগ, লখনা, আলফানসো, তোতাপুরি, মধুচুষকি, কাটিমন প্রভৃতি জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রকৃতিভাবে আমের উৎপাদন এক বছর বেশি হলে পরের বছর কম হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধারায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত বছরের মতো এবারও ফলন হয়েছে বেশ ভালো।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনুকূল আবহাওয়া থাকায় এবার জেলার ৫ উপজেলার ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর আম বাগান থেকে চার লাখ ৫৮ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বেশ কয়েকটি পক্ষ। মৌসুম শুরুর দুই থেকে তিন মাস আগে থেকেই আরম্ভ হয় বাগান কেনা বেচা। কেউ কেউ মুকুল আসার আগেই বাগান কিনে থাকেন। আবার কেউ মুকুল দেখে, গাছে গুটি ধরা এবং বড় হওয়ার সময় বাগান কিনে থাকেন। কোনো কোনো চাষি একই বাগান ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য কিনে নেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ৪টি প্রধান বাজারসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় অর্ধশত বাজার রয়েছে। এর মধ্যে দেশের বড় বাজারটি বসে কানসাটে। বহুকাল আগেই গড়ে উঠেছে এ বাজারটি। জেলা সদর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কের কানসাট গোপালনগর মোড় থেকে কলবাড়ী পর্যন্ত সড়কের দু’ধারে প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আমের পাইকারি ও খুচরা কেনা বেচা। এখানে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩ শতাধিক আমের আড়ত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের আমের বড় বাজারটি বসে পুরনো বাজারের সদর ঘাটে। জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরের গোমস্তাপুরের রহনপুরে বসে আরেক বাজার। সীমান্তবর্তী উপজেলার ভোলাহাটেও বসছে আমের বাজার। ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বসা আড়তগুলো থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা আম কিনে নিয়ে যান। এ চারটি প্রধান আম বাজারের বাইরে ছোট ছোট আম বাজারগুলোতেও প্রচুর কেনা বেচা হচ্ছে।

কানসাট ও সদরঘাট আম বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গুটি, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত আমের বেচাকেনা চলছে। কিছু কিছু ল্যাংড়া আমও নেমেছে। চাষিরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ের প্রচণ্ড তাপ ও গরমের কারণে এক সঙ্গেই বেশি আম পেকে গেছে। তাই মৌসুমের শুরুতেই বেশি পরিমাণ আম বাজারে চলে আসায় এখন দাম কিছুটা কম। গুটি জাতের আম বিক্রি হচ্ছে, ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মন দরে। গোপালভোগ ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা এবং ক্ষিরসাপাত ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষিরা আশা করছেন আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমের দাম বাড়বে।

সদরঘাটের আম আড়তদার সুকুমার জানান, ‘আমের বাজার প্রতিদিনই ওঠানামা করছে। এখন গোপালভোগ আম বিক্রি করছি ২ হাজার টাকা মন এবং ক্ষিরসাপাত ২২০০ টাকা মন দরে।’

আম চাষি কামরুল ইসলাম জানান, ‘আমের আকার ভেদে মন প্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা দাম কম বেশি হয়। ক্ষীরসাপাত বিক্রি করছি ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং গোপালভোগ ১৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা দরে।’

আম ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যাপারীরা আসার কারণে বেচাকেনা জমজমাট হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি মৌসুমে শুধু আম বেচাকেনায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা এবং এর বাইরে শ্রমিক, ঝুড়ি, পরিবহনসহ অন্য খাতে, সব মিলে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী জানান, ‘৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমি থেকে এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টন। গত বছর ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়েছিল। এবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে চার লাখ টনেরও বেশি। এবারের বেচাকেনার পরিসংখ্যানটা এখনো তৈরি হয়নি। তবে, যেহেতু আমের উৎপাদন বেশি, দাম বেশি। সেহেতু আমের বেচাকেনা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি হবে’।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, ‘বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয়। পৃথিবীতেই আম একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পণ্য হলেও আমরা এখনো এটাকে শিল্প পণ্য হিসেবে নিতে পারিনি। আম প্রক্রিয়াকরণ করছি না। প্রক্রিয়াকরণ করা হলে এখন যে বাজার মূল্য বলা হচ্ছে তা ৩ গুণ বেড়ে যাবে। কর্মসংস্থান হবে।’

বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এখনকার আম। গত বছর চীনসহ কিছু দেশে রপ্তানি হয়েছিল। চলতি মৌসুমে শিবগঞ্জ উপজেলার চককৃত্তি ইউনিয়নের চাতরা গ্রামের শামীম রেজা সোহাগ গত শুক্রবার দুই টন আম ইতালিতে রপ্তানি করেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী জানান, ‘মৌসুমে এখন পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো। আশা করছি উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা তা অর্জিত হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত