ফুটবল শুধু ভালোবাসা নয় আমাদের আবেগ

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

একটা সময় জার্সি পরে খেলোয়াড় খেলত আর দর্শক খেলা দেখত। এটাই ছিল চিরচেনা দৃশ্য। এক কথায় জার্সি ছিল খেলার পোশাক। যুগ পরম্পরায় জার্সি ফ্যাশনট্রেন্ডের অংশ হয়ে উঠেছে। আগামীকাল পর্দা উঠছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই প্রিয় দল ও খেলোয়াড়ের জার্সি পরে খেলা দেখা, ঘুরে বেড়ানো। নিজে কোন দলের সমর্থক সেটাই যেন জানান দেওয়া। আর তাই জার্সির বাজারও সরগরম। যাদের জার্সিতে অনীহা, তাদের জন্য আছে ফুটবল শাড়ি। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

বিশ্বকাপের হাওয়া বইতে শুরু করেছে ক্যাম্পাস, কফিশপ, অফিস কিংবা বাড়ির ড্রয়িংরুমে। জার্সি বিক্রির দোকানগুলোতে বইছে ঈদের হাওয়া। বিগত বছরগুলো বাংলাদেশ অফিশিয়াল জার্সি তৈরি করলেও এ বছর এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ফ্যানজার্সি তৈরি করছে। প্রতি বিশ্বকাপে দেশের বাজারে বাড়ে ফুটবল জার্সির চাহিদা। প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম, নম্বর কিংবা নিজের নাম ছাপিয়ে জার্সি কিনছেন অনেকে। যদিও দেশের অর্ধেক মানুষই কিনছেন আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি। তবে জার্সির মান, ফেব্রিকস, আরাম, আসল ও নকল জার্সি চেনার এসব বিষয় জানা জরুরি।

বহুরূপী জার্সি

রেপ্লিকা জার্সি সমর্থকদের জন্য তৈরি হয়। এটি তুলনামূলক ঢিলেঢালা, আরামদায়ক এবং দাম কম। প্লেয়ার ভার্সন জার্সি মাঠে খেলোয়াড়রা যে ধরনের জার্সি পরেন তার কাছাকাছি। এটি শরীরের সঙ্গে ফিট থাকে এবং উন্নত মানের কাপড় দিয়ে তৈরি হয়। অথেনটিক জার্সি হলো অফিশিয়াল সংস্করণ, যা সরাসরি ব্র্যান্ডের অনুমোদিত পণ্য। এর দাম সবচেয়ে বেশি।

জার্সির কাপড় : দেশের আবহাওয়া এখন উষ্ণ ও আর্দ্র। ফলে জার্সি কেনার সময় শুধু ডিজাইন নয়, কাপড়ের বিষয়ও গুরুত্ব দিতে হবে। স্পোর্টস জার্সি প্রধানত পলিয়েস্টার দিয়ে তৈরি। যা হালকা, দ্রুত শুকায় এবং ঘাম শোষণ করে সহজে। গরম আবহাওয়ার জন্য বেশি উপযোগী। এ ছাড়া মাইক্রো পলিয়েস্টার জার্সি মূলত সাধারণ পলিয়েস্টারের চেয়ে উন্নত। এটি আরও নরম, হালকা এবং বাতাস চলাচলের জন্য উপযোগী। দীর্ঘ সময় পরলেও অস্বস্তি কম হবে। ড্রাই-ফিট ফেব্রিকসে বিভিন্ন স্পোর্টস ব্র্যান্ডের নিজস্ব প্রযুক্তির কাপড় রয়েছে, যেগুলোকে সাধারণভাবে ড্রাই-ফিট ধরনের কাপড় বলা হয়। ঘাম দ্রুত শুকিয়ে শরীরকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। আবার যারা একদমই গরম সহ্য করতে পারেন না তাদের জন্য উপযোগী কটন জার্সি। তবে দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে ঘেমে ভারী ও অস্বস্তিকর হয়।

জার্সির মাপজোক : জার্সি তো এখন অনেকেই পরবেন। তবে অধিকাংশেরই দেখা যায় মাপজোক ঠিক নেই। হয়তো খুব টাইট জার্সি কিংবা অতিরিক্ত ঢিলেঢালা। তাই জার্সি কেনার আগে দেখে নিন কাঁধের মাপ ঠিক আছে কি না। অনলাইনে কিনলে সাইজ চার্ট দেখে অর্ডার করুন। প্লেয়ার ভার্সন জার্সি সাধারণত বেশি ফিটেড হয়, তাই প্রয়োজন হলে এক সাইজ বড় নেওয়া যেতে পারে।

জার্সির সঙ্গে অনুষঙ্গ : জার্সি পরলেই হবে না দেখতে-শুনতেও ভালো লাগতে হবে। ছেলেরা জার্সির সঙ্গে জিন্স বা চিনো প্যান্ট পরতে পারেন। পায়ে কেডস বা স্নিকার্স চলবে। জার্সি খুব ঢিলেঢালা হলে সামনের অংশ সামান্য টাক-ইন করতে পারেন। ডেনিম শর্টস, কার্গো প্যান্টও পরা যাবে। স্নিকার্স, ক্যাপ ও সানগ্লাস যোগ করলে লুক আরও আকর্ষণীয় হবে। নারীদের জন্য ট্রেন্ডি লুক ওভারসাইজ জার্সি ও ওয়াইড-লেগ জিন্স, প্লিটেড স্কার্ট। স্নিকার্স এবং ক্রসবডি ব্যাগ যোগ করলে স্পোটি লুক হবে। জার্সির সঙ্গে মেয়েদের স্ট্রেইট কাট জিন্স বা ট্রাউজার পরতে পারেন। সাদা স্নিকার্স বা কেডস স্টাইলিশ দেখায়। ওভারসাইজ জার্সি চাইলে বেল্ট ব্যবহার করে ফ্যাশনেবল লুক তৈরি করা যায় । ঘড়ি, সানগ্লাম, স্কার্ফ ও এয়ার রিং ব্যবহার করতে পারেন।

জার্সির যত্ন : জার্সি ঠান্ডা পানিতে উল্টো করে ধুতে হবে। ব্লিচ ব্যবহার করা যাবে না। হাত দিয়ে রগরানো যাবে না। সারাসরি রোদে না শুকিয়ে ছায়ায় বা ফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে নিন। প্রিন্টের ওপর সরাসরি ইস্ত্রি না করে উপরে সুতির পাতলা কাপড় দিয়ে তবেই ইস্ত্রি করুন।

কোথায় পাবেন

বহুরূপী ফুটবল জার্সি পাবেন স্টেডিয়াম মার্কেটে। ঢাকার ব্র্যান্ড শপ, ফুটপাতে এলাকার অলিগলির দোকানগুলোতেও পাবেন জার্সি। তবে অনলাইনেও জার্সির বড় বাজার তৈরি হয়েছে। ফেসবুকভিত্তিক অসংখ্য স্পোর্টস স্টোর এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে অর্ডার দিয়ে ঘরে বসেই জার্সি কিনতে পারবেন। অনেক প্রতিষ্ঠান কাস্টমাইজড জার্সি করে দিচ্ছে।

জার্সির দাম নির্ভর করে এর মান, কাপড়, প্রিন্টিং কোয়ালিটি এবং ব্র্যান্ডের ওপর। সাধারণত লোকাল বা বেসিক জাসি কিনতে পারবেন ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায়। ভালো মানের রেপ্লিকা জার্সি ৮০০ থেকে শুরু। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির রেপ্লিকা জার্সি পাবেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। প্লেয়ার ভার্সন জার্সি ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। অফিশিয়াল জার্সি ৮ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকারও বেশি।

অনলাইন শপ অফিশিয়াল ফিফা স্টোর (Official FIFA Store), অ্যাডিডাস ইউএস এবং দারাজ বাংলাদেশের মাধ্যমে বিশ্বমানের জার্সি ও ফ্যান গিয়ার অর্ডার করতে পারেন। বাংলাদেশে প্রিমিয়াম অথেনটিক ও কাস্টমাইজড জার্সির জন্য জার্সি ফ্রিক বিডি (Jersey Freak BD) বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া ঢাকার স্টেডিয়াম মার্কেট, বনানী, নিউমার্কেট এবং বিভিন্ন স্পোর্টস শপেও পছন্দের দেশের জার্সি পেয়ে যাবেন। অনলাইনে সবচেয়ে কম দামে জার্সি কিনতে পারবেন দারাজে। এ প্রসঙ্গে দারাজের মুখপাত্র জানান, ‘দারাজের জার্সি সারা বছরই বিক্রি হয়। তবে বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে ততই বিক্রি বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার জার্সি অর্ডার পাচ্ছেন তারা। সর্বনিম্ন দাম ৯৫ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। জার্সির ফেব্রিকসের ওপর এর দাম নির্ভর করে।’ এ ছাড়া আজকের ডেল, ক্রিকশপ বিডি, জার্সি শপ বিডি, জার্সি ফ্রিক বিডিতে জার্সি বিক্রি হচ্ছে। তা ছাড়া ডিমানির অ্যাপ ব্যবহার করেও কেনা যাবে জার্সি। জার্সির শপের মধ্যে আছে রবিন স্পোর্টস, স্পোর্টস অ্যান্ড স্পোর্টস, স্পোর্টস জোন। মূল জার্সির পাশাপাশি অ্যাওয়ে জার্সিসহ অনুশীলন জার্সিও কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া সহনশীল দামে বিখ্যাত ক্লাব ও টিমের জার্সি কিনতে হলে গুলিস্তানের বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশে স্পোর্টসের অনেক দোকান আছে। এ ছাড়া উত্তরায় H.M Plaza-এর পাশে যে স্পোর্টস মার্কেট আছে ওখানেও পাবেন। বনানীতেও H.M Plaza-এর শোরুমে পাবেন অরিজিনাল জার্সি। অ্যাডিডাস, পোলো, পুমা ও নাইকি ব্র্যান্ডের জার্সিগুলো পাওয়া যাচ্ছে বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট, গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট, গুলশান ডিসিসি মার্কেট ১ ও ২-এ। ব্র্যান্ডের জার্সিগুলোর জন্য গুনতে হবে একটু বাড়তি দাম। এ ছাড়া আরেকটু বেশি দামে ও ভালো কাপড়ের জার্সি কিনতে হলে পান্থপথ এবং বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউতে অবস্থিত Bodz & Sports নির্ভরযোগ্য জায়গা।

জনপ্রিয় দলের জার্সি

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো উন্মোচন করেছে নতুন হোম ও অ্যাওয়ে জার্সি। শুধু খেলার পোশাক নয়, এসব জার্সিতে ফুটে উঠেছে প্রতিটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ফুটবল ঐতিহ্যের গল্প।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে বরাবরের মতোই রয়েছে আকাশি-সাদা ডোরা, তবে এবার যুক্ত হয়েছে তিন বিশ্বকাপজয়ী সময়ের স্মৃতিবাহী বিশেষ ডিজাইন। ব্রাজিলের জার্সিতে জাতীয় পতাকার রঙের আধুনিক ব্যবহার এবং সাহসী গ্রাফিক নকশা নজর কাড়ছে।

ক্রোয়েশিয়া ফিরিয়েছে তাদের বিখ্যাত চেকারবোর্ড প্যাটার্ন, তবে আরও আধুনিক রূপে। ইংল্যান্ড ক্লাসিক সাদা জার্সির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, আর অ্যাওয়ে জার্সিতে এনেছে লাল ও গাঢ় নীলের নতুন সমন্বয়।

ফ্রান্সের জার্সিতে ফ্যাশন জগতের ‘হাউত কুতুর’-এর ছোঁয়া স্পষ্ট। অন্যদিকে জার্মানি অতীতের বিশ্বকাপজয়ী ঐতিহ্যকে স্মরণ করে ফিরিয়ে এনেছে পরিচিত ডায়মন্ড ও শেভরন নকশা।

নেদারল্যান্ডসের উজ্জ্বল কমলা জার্সি বরাবরের মতোই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। আর পর্তুগালের জার্সিতে ঢেউ-অনুপ্রাণিত নকশার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে দেশটির সমুদ্রযাত্রা ও অভিযানের সমৃদ্ধ ইতিহাস। সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপের জার্সিগুলো শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের জন্য নয়, ফ্যাশন ও জাতীয় পরিচয়ের অনন্য প্রকাশ হিসেবেও আলোচনায় রয়েছে। স্পেনের হোম জার্সিতে লাল-হলুদের সূক্ষ্ম ডোরাকাটা নকশা। অ্যাওয়ে জার্সিতে পুরনো বই ও পা-ুলিপির অলঙ্করণ থেকে নেওয়া সোনালি প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়েছে, যা দেশটির সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে সামনে আনে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত