ভারতের অবৈধ ‘পুশইন’ ইস্যুতে অনড় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের জোরপূর্বক পুশইন ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। বিজিবিকে সহায়তা করতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। গভীর রাতে মাইকিং শুনে স্থানীয় অনেকেই লাঠি, ফালা ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নিচ্ছেন। গত ১০ দিনে সীমান্তের ৩৬টি পয়েন্টে পুশইনের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবারও জামালপুরের বকশীগঞ্জের রামরামপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইনে বাধা দেওয়ায় বিজিবির সঙ্গে তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হয় বিএসএফ।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই গত সোমবার থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে বিজিবি ও বিএসএফের ডিজি পর্যায়ে চার দিনের সীমান্ত সম্মেলন। সম্মেলনের তৃতীয় দিন গতকাল বুধবার আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ও তাদের কর্মকা- সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অন্যান্য অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ এবং চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের নিষ্পত্তি, তিনবিঘা করিডর দিয়ে পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন, আগরতলা থেকে আখাউড়াগামী ৪টি খালের বর্জ্য পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, মুহুরীর চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর তীর সংরক্ষণ কার্যক্রম, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে অবৈধ ড্রোন/হেলিকপ্টার উড্ডয়ন বন্ধ, ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল সম্পর্কে নেতিবাচক অপপ্রচার বন্ধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর আগেরদিন মঙ্গলবারের বৈঠকে পুশইন-পুশব্যাক ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে বলে বিজিবি সূত্র জানিয়েছে।
ভারত থেকে ২০২৫ সালে ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাভাষী ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া শুরু হয়। ওই বছর দুই হাজার ৩৫৬ জনকে পুশইন করা হয়। তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ১৩৪, রোহিঙ্গা ২২৬ ও বাংলাদেশি নাগরিক এক হাজার ৯৯৬ জন। এর মধ্যে দুই হাজার ১৫৬ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছিল বিজিবি। তবে ২০২৬ সালে কাউকে বাংলাদেশে পুশইন করতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পর আবার পুশইনের চেষ্টা শুরু করে বিএসএফ। এই দফায় ১০ দিনে সীমান্তের ৩৬টি পয়েন্টে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবি বলছে, শক্ত নজরদারি ও প্রতিরোধের কারণে এবার একজনকেও ঠেলে পাঠানো সম্ভব হয়নি। পুশইন মোকাবিলায় অনেক স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারাও সতর্ক অবস্থানে ছিল।
গতকাল বুধবারও জামালপুরের বকশীগঞ্জের রামরামপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতের নন্দীরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা একজনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা চালান। বিষয়টি টের পেয়ে জামালপুর-৩৫ বিজিবির সদস্যরা ও স্থানীয়রা প্রতিরোধ করেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ব্যক্তিকে বাংলাদেশের দিকে আসতে বাধ্য করছেন বিএসএফ সদস্যরা। এ সময় বিজিবি বাধা দেয়। এ নিয়ে বিজিবি-বিএসএফ সদস্যদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। বিএসএফ সদস্য ওই ব্যক্তিকে বারবার ঠেলে বাংলাদেশের দিকে যেতে বলেন। তবে ওই ব্যক্তি আসতে চাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে বিএসএফের একজন সদস্য বলেন, এমন বাড়াবাড়ি করলে গুলি করে দেব। মুহূর্তে এর প্রতিবাদ করেন বিজিবি সদস্যরা। তারা পাল্টা বিএসএফ সদস্যদের বলেন, ‘আপনি এ কথা কেন বললেন। আপনি গুলি করলে আমরা কি বসে থাকব? এ সময় বিজিবির পেছনে বাংলাদেশ অংশে আনসার সদস্য, পুলিশ ও স্থানীয় কয়েক শতাধিক জনতা লাঠিসোটা হাতে অবস্থান নেন এবং বিএসএফকে উদ্দেশ করে চেঁচিয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পিছু হটে বিএসএফ। আর যে ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠাতে চেয়েছিল তিনি শূন্যরেখায় আটকে আছেন। এ নিয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিএসএফ ওই ব্যক্তিকে ফেরত না নিয়ে নো ম্যান্স ল্যান্ডে রেখেই চলে যায়।
জামালপুর বিজিবি-৩৫ অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, একজনকে পুশইনের চেষ্টা করেছিল। আমরা তাকে ফেরত পাঠিয়েছি। পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ৩৫ বিজিবি চার দিনে এ পর্যন্ত ১০টি পুশইন চেষ্টা প্রতিহত করেছে।
এর আগে গত ৩ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত চার দিনে ঝিনাইদহ সীমান্ত, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বঙ্গাবাড়ী সীমান্ত, নওগাঁর সাপাহারের হাপানিয়া, লালমনিরহাটের বারখাতা, পাটগ্রাম ও আশপাশের সীমান্ত এলাকা এবং পঞ্চগড় সীমান্ত দিয়ে ২৩টি পুশইনের ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল। লাইট বন্ধ করে অন্ধকারের মধ্যে পুশইনের প্রত্যেকটি ঘটনা বিজিবি ঠেকিয়ে দেয়।
বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বলেন, কেউ বাংলাদেশি হলে তাকে গ্রহণে আপত্তি নেই। কিন্তু তার প্রমাণ দিতে হবে। শুধু সীমান্তে এনে ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ তা গ্রহণ করবে না। প্রতিটা পুশইনের ঘটনায় আমরা বাধা দিয়েছি, ঘটতে দেইনি।
পুশইন ঠেকাতে বিজিবির কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদারে গত সোমবার থেকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের মোতায়েনের কথা জানিয়েছে আনসার বাহিনী। সংস্থাটির উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আশিকুজ্জামান জানান, সীমান্তবর্তী ১১ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ইতিমধ্যে উপজেলা ও থানা আনসার, ভিডিপি এবং টিডিপি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধ ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবির কার্যক্রমে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে আনসার-ভিডিপি সদস্যরা। প্রয়োজনে অতিরিক্ত জনবল সরবরাহের জন্য আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমে আটক ৪৯০ : এদিকে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে গেল মে মাসে তিন দেশের ৪৯০ জন নাগরিককে আটক করেছে বিজিবি। এর মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক ৯২ জন, ভারতীয় ছয়জন ও মিয়ানমারের ৩৯২ জন। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার ও অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময়ে সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৭৭ কোটি ৭৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান পণ্যসামগ্রী জব্দ হয়েছে বলে গতকাল জানিয়েছেন বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম।