এবার সাড়ে ৭ কিমি পতাকা

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৩:০৫ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবলের জার্মানি দলের ভক্ত মাগুরার সেই কৃষক আমজাদ হোসেন (৭৪) এবার প্রদর্শন করেছেন সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা। গতকাল বুধবার সকালে সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক স্কুল মাঠে তিনি এই পতাকা প্রদর্শন করেন, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই নতুন করে আলোচনায় আসেন আমজাদ হোসেন। জার্মান ফুটবল দলের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে তিনি প্রতি বিশ্বকাপে তৈরি করেন বিশাল আকৃতির জার্মানির পতাকা। প্রায় দুই যুগ ধরে চলা এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এ বছর তিনি তৈরি করেছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা। আমজাদ হোসেন মাগুরার সদর  উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের নেহাল উদ্দিন মোল্যার ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে নিজের সামর্থ্য ও ভালোবাসার জায়গা থেকে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় তিনি জার্মানির পতাকা তৈরি করে থাকেন। তার এই পতাকা তৈরির গল্প এখন শুধু মাগুরা নয়, দেশ ছাড়িয়ে বিশে^র ফুটবলপ্রেমীরা জানে।

গতকাল এই পতাকা দেখতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ নিশ্চিন্তপুর মাঠে এসে উপস্থিত হয়। প্রদর্শন অনুষ্ঠানে আমজাদ জানান, এই পতাকা অভিযান চলবেই। এই বিশ্বকাপে জার্মান চ্যাম্পিয়ন হলে ২০৩০ সালে তিনি এবারের থেকে তিন গুণ অর্থাৎ ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা বানাবেন, যা মাগুরা ভায়না থেকে সীমাখালী পর্যন্ত প্রদর্শিত হবে।

আমজাদ হোসেনের পতাকা তৈরির যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে। সে বছর জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ উপলক্ষে তিনি প্রায় ৩৫০ গজ দীর্ঘ একটি জার্মান পতাকা তৈরি করেন। এরপর প্রতি বিশ্বকাপেই তিনি পতাকার দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে চলেছেন। ২০০৬ সালে দেড় কিলোমিটার, ২০১০ সালে আড়াই কিলোমিটার, ২০১৪ সালে সাড়ে তিন কিলোমিটার এবং ২০১৮ সালে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরি করেন।

আমজাদ ১৯৮৭ সালে কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। সে সময় নানা রকম চিকিৎসা নিয়েও কোনো সুফল পাননি। পরে মাগুরার মনোরঞ্জন কবিরাজ নামের এক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শে জার্মানের হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবনের পরই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারপর থেকেই তিনি জার্মানের প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠেন।

আমজাদ নিজ খরচে তৈরি করেছেন এই পতাকা। এটি তৈরি করতে তার ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর জন্য তিনি দশ শতক জমি বিক্রি করেছেন। পতাকা তৈরির জন্য তাকে অনেক আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। ২০১৪ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য তার এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন তিনি। সে সময় পতাকা তৈরির খরচ জোগাতে তিনি ৩০ শতক জমি বিক্রি করেন। ওই বছরের পতাকা তৈরিতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল।

আমজাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৪ সালে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূত মাগুরায় এসে তার তৈরি পতাকার উদ্বোধন করেন। ওই বছর ১২ জুলাই জার্মান চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. ফার্দিনান্দ ফন ফারসি ওয়েহে তাকে মাগুরা স্টেডিয়ামে জার্মানের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা ও লিখিতভাবে জার্মান ফ্যান ক্লাবের সদস্য পদ দেন। বিশ্বকাপে জার্মান দলের জয়ে আমজাদ গণভোজের আয়োজন করেন। এই খবর বাংলাদেশ, জার্মান ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ২০১৮ সালেও জার্মান দূতাবাসের কর্মকর্তারা তার পতাকা প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

আমজাদ হোসেন বলেন, আমি ভালোবাসা থেকেই এসব করি। এ জন্য কখনো কারও কাছে সাহায্য চাইনি। এবার আমার সন্তানেরাই পতাকা তৈরির খরচ দিয়েছে। আমি এই পতাকাটি জার্মান দূতাবাসকে উপহার দিতে চাই। তারা চাইলে এটি জাদুঘরে সংরক্ষণ করতে পারে। তিনি মনে করেন, তার পতাকার তৈরির বিষয়টি বিশে^ বাংলাদেশকে নতুন এক পরিচয়ে পরিচিত করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত