মাটির নিচে আস্ত এক গ্রাম

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:৩৮ এএম

দোদুল্যমান বাঁশঝাড়, লাল প্লাস্টিকের চেয়ারসহ রাস্তার ধারের খাবারের দোকান এবং পানীয় রাখার রেফ্রিজারেটর ভিয়েতনামের গ্রামীণ এলাকার এক পরিচিত দৃশ্য। ভিয়েতনামের কোয়াং ট্রি (বর্তমানে কোয়াং বিন) প্রদেশের ভিন মক গ্রাম। দেখলে মনে হবে এটি আটপৌরে এক শান্ত জনপদ। কিন্তু এই মাটির নিচেই লুকিয়ে আছে এক রোমাঞ্চকর ও হাড়হিম করা ইতিহাস। গত শতকের ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ভয়াবহ বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে মাটির নিচে আস্ত এক ‘সুড়ঙ্গ গ্রাম’ তৈরি করেছিলেন স্থানীয়রা। যেখানে ৪০০ মানুষ টানা ছয় বছর সূর্যের আলো না দেখে কাটিয়ে দিয়েছেন।

সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, আট বছর ধরে ভিন মক এলাকায় প্রায় ৯ হাজার টন বোমা ফেলা হয়েছিল। ১৯৬৫ সালের আগে, কোয়াং ট্রি উপকূলের অন্য অনেক বসতির মতোই ভিন মক একটি শান্তিপূর্ণ জেলেদের গ্রাম ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবকিছু বদলে যায় এবং এই এলাকাটি সবচেয়ে বেশি বোমাবর্ষণের শিকার হওয়া স্থানগুলোর একটিতে পরিণত হয়। টানা বোমা হামলা থেকে প্রাণ বাঁচাতে স্থানীয়রা তাদের জীবনযাত্রা ভূগর্ভে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভিন মকের মাটি সহজে ধসে পড়া রোধ করার জন্য যথেষ্ট শক্ত ছিল, কিন্তু সাধারণ সরঞ্জাম দিয়ে খনন করার জন্য যথেষ্ট নরমও ছিল। ১৯৬৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং দুই বছর পর তা সম্পন্ন হয়। ১.৬ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ ব্যবস্থাটিকে একটি অসাধারণ প্রকৌশলগত কৃতিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে নকশা করা হয়েছিল।

বোমার অভিঘাত তরঙ্গের প্রভাব কমাতে সুড়ঙ্গগুলো আঁকাবাঁকাভাবে খোঁড়া হয়েছিল। খিলানযুক্ত ছাদ এবং পুরু দেওয়াল বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে এদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। পুরো ব্যবস্থাটিতে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এগুলো বায়ুচলাচল, পালানোর পথ এবং বাইরের সরবরাহ উৎসের সঙ্গে সংযোগ হিসেবে কাজ করত। কাঠামোটি ১৩টি প্রবেশপথ দিয়ে নির্মিত হয়েছিল, যার মধ্যে ৭টি সমুদ্রমুখী এবং ৬টি পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। এ ছাড়াও, এই ব্যবস্থায় একটি মিষ্টি জলের কূপ এবং প্রতিসমভাবে সাজানো বায়ুচলাচলের ছিদ্র রয়েছে, যা একটি প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ তৈরি করে। এই সুড়ঙ্গ ব্যবস্থাটি তিনটি স্তর নিয়ে গঠিত, যা ভূগর্ভের প্রায় ১৫-২৩ মিটার গভীরে অবস্থিত। সুড়ঙ্গের ভেতর ছিল পরিবারগুলোর থাকার জন্য ছোট ছোট কুঠুরি, কূপ, এমনকি রান্নার জায়গাও। রান্না করার সময় ধোঁয়া যাতে ওপর থেকে দেখা না যায়, সে জন্য তারা ব্যবহার করতেন বিশেষ ‘হোয়াং কাম’ চুলা।

ভিন মক টানেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নয়, ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম। বর্তমানে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত এই সুড়ঙ্গে দেখা যায়, সেই ‘ম্যাটারনিটি ওয়ার্ড’, যেখানে যুদ্ধের অন্ধকারেও অন্তত ১৭টি শিশু জন্ম নিয়েছিল। মাটির নিচের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার আর শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে বছরের পর বছর টিকে থাকা ছিল এক অকল্পনীয় লড়াই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বছর ধরে চলা ভয়াবহ বোমাবর্ষণেও এই সুড়ঙ্গের ভেতরে একজন মানুষেরও মৃত্যু হয়নি। বর্তমানে এটি ভিয়েতনামের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। যুদ্ধ মানুষকে কতটা চরম পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে পারে, ভিন মক টানেল তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত