যুক্তরাষ্ট্রের অহমে আঘাত

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট বাস্তবে হয়ে উঠেছেন অশান্তির অপদেবতা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকালাস মাদুরোকে অপহরণ, ইসরায়েলের মদদে ইরানের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, কথিত মাদক নির্মূলের নামে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে একের পর এক বিমান হামলাসহ তার বহু সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ কম্পনের সৃষ্টি করেছে। ইরান যুদ্ধ এখন পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ভুলের এক উদাহরণ হয়ে থাকবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যতে শত্রুদের দমানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

এ যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জোট বা বন্ধুত্বে ফাটল ধরেছে। পশ্চিম এশিয়ার চরম অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে আরব দেশগুলো নিজেদের ‘স্থিতিশীলতার প্রতীক’ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এটি ছিল তাদের ব্যবসায়িক মডেল বা মূল শক্তি। কিন্তু এ যুদ্ধের কারণে তাদের সেই স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি এতটাই নষ্ট হয়েছে যে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বা মেরামত করতে এখন বহু বছর লেগে যাবে। এসব দেশের কর্মকর্তারা এখন গোপনে জোট পরিবর্তনের কথা বলছেন। তারা সমুদ্রের ওপারের দেশ ইরানের সঙ্গে মানিয়ে চলার পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও তার বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ফুরিয়ে ফেলেছে। সেই সঙ্গে তার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ইরানের শাসকগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন মোকাবিলা করে টিকে গেছে। যদিও এই যুদ্ধে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানিসহ শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে হারিয়েছে ইরান। উপসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক এই সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে। সেটা হলো ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে ইরানের দাবিগুলো ফাঁকা বুলি ছিল না। ইরানের অসংখ্য ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা সে দাবির সপক্ষেই প্রমাণ রাখে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে জানা গেছে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া সমঝোতাকে পূর্ণাঙ্গ ‘শান্তিচুক্তি’ বলা যাবে না। দুই পৃষ্ঠার এ দলিলে ১৪টি  শর্ত রয়েছে। এখনো এর পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ করা হয়নি। তবে এ সমঝোতা স্মারকের আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বেড়েছে এবং ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ উঠে গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনে তীব্র মতভেদ : ইরানের সঙ্গে করা সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ প্রশাসনের অভ্যন্তরে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যের বরাতে সিআইএ পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে কতটুকু রাজি তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে। আলোচনা সম্পর্কে অবগত তিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। শুধু সিআইএ পরিচালকই নন, ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগীদের অনেকেই এই চুক্তি নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। সূত্রের তথ্যমতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হ্যাগসেথ গত রবিবার ঘোষিত এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ট্রাম্পের দুই বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার এই চুক্তির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।

রবিবারের ঘোষণার আগে ট্রাম্প এবং তার উপদেষ্টাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে আলোচনা করে। গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, ইরানি কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তিটি নিয়ে যেভাবে আলোচনা করছেন, তা মধ্যস্থতাকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে একেবারেই মিলছে না। র‌্যাটক্লিফ ও রুবিও জানান, এই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের চরম সন্দেহ রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের পারমাণবিক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে, ইরান শেষ পর্যন্ত তা মানবে কি না। একটি সূত্র জানিয়েছে গোয়েন্দা তথ্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের আসল উদ্দেশ্য, চুক্তির অধীনে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত