যুদ্ধবন্ধে শান্তিচুক্তির খসড়াতে সই করতে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে এই চুক্তিকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননসহ সব ফ্রন্টেই বন্ধ থাকবে হামলা-পাল্টা হামলা। এই সমঝোতাকে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তিকে নিজেদের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখছে ইসরায়েল। গত রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা আসার আগে সংবাদমাধ্যমে যেটুকু তথ্য আসছিল, তাতেই ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। দলমত নির্বিশেষে ইসরায়েলের সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করে। ইসরায়েলের জনপ্রিয় হিব্রু দৈনিক ‘ইয়েদিওত আহরোনত’-এর রবিবার সংখ্যার প্রধান শিরোনাম ইসরায়েলের বর্তমান গণ-মনোভাবকে মাত্র দুটি শব্দে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে তারা আখ্যা দিয়েছে : ‘বাজে চুক্তি’। ঘোষিত যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতও বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ।
তেল আবিবের কর্মকর্তারা বলছেন, এই যুদ্ধে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সীমিতকরণসহ তাদের কোনো লক্ষ্যই পূরণ হয়নি। বিষয়টি মানতে পারছে না ডানপন্থি ইসরায়েলিরা। তাদের দৃষ্টিতে এই চুক্তি তেল আবিবের জন্য একটি রাজনৈতিক পরাজয়। কারণ চুক্তির শর্ত মেনে, লেবাননে বোমাবর্ষণ বন্ধে বাধ্য হবে আইডিএফ। অথচ, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে বরাবরই নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে তেল আবিব। শান্তিচুক্তির কারণে প্রতিটি প্রধান রেডলাইন পূরণে ইসরায়েল ব্যর্থ হয়েছে বলে মত নেতানিয়াহু প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের। কারণ, এবারের যুদ্ধে তাদের লক্ষ্য ছিল তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করা এবং হিজবুল্লাহ-হুতিসহ আঞ্চলিক মিত্রদের পিছু হটানো। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান স্থগিতের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।
চুক্তিতে লেবাননে ইসরায়েলি যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের অধিকৃত বিশাল এলাকা থেকে তাদের সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে কি না, তা জানা যায়নি। গত মার্চের শুরু থেকে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তবে সোমবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আমি একটি স্পষ্ট নীতি অনুসরণ করছি, যার অধীনে সীমান্ত এবং ইসরায়েলি জনপদগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে আমাদের সামরিক বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে।
তবে চুক্তিটি সফল করার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘অত্যন্ত
কৃতজ্ঞ’ থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি গত রবিবার লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলের চালানো বিমান হামলার তীব্র সমালোচনা করে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এই হামলার কারণে চুক্তিটি প্রায় ভেস্তেই যেতে বসেছিল। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, বৈরুত হামলা নিয়ে নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ ও কটাক্ষ করেছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য ইসরায়েলের ওপর থেকে ‘অস্তিত্বের সংকট দূর করা’। অর্থাৎ ইরানের যেকোনো ধরনের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিন মিসাইল কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। সেইসঙ্গে ইরানের সরকার উৎখাত করা। এ ছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি ও গাজার হামাসের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলোকে তেহরানের সমর্থন চিরতরে বন্ধ করার দাবিও ছিল ইসরায়েলের। নেতানিয়াহুর সাবেক ভারপ্রাপ্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাকব নাগেল বলেন, শেষ পর্যন্ত যা-ই ঘটুক না কেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে নিজের একচ্ছত্র বিজয় জাহির করবেন।
এদিকে গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তিনি এমন একটি নীতি অনুসরণ করছেন, যার অধীনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করবে। এর উদ্দেশ্য সীমান্ত ও ইসরায়েলি জনপদগুলোকে জিহাদি উপাদান থেকে সুরক্ষা দেওয়া। তিনি আরও বলেন, এসব নিরাপত্তা অঞ্চল স্থানীয় বাসিন্দাশূন্য করা হবে এবং ভূমির ওপর ও নিচে থাকা সব সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর যেসব বাড়ি সন্ত্রাসী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোও ধ্বংস করা হবে।