ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই যখন পুরো আটলান্টা স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ল, তখন ক্যামেরার চোখ আটকে গেল কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার ওপর। মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন এই বুড়ো বাজপাখি। ইউরোপ সেরা ও ২০১০ আসরের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে জীবনের সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে, একাই ৭টি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক এক ড্র। ৪১ বছর বয়সে উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্যাট জেনিংসের পর তিনিই প্রথম ৪০ ঊর্ধ্ব গোলরক্ষক, যিনি বিশ্বকাপে এক ম্যাচে এত সেভ করার কীর্তি গড়লেন। অথচ এই মহাকাব্যিক অর্জনের রাতে গ্যালারিতে তার পাশে ছিল না কোনো পরিবার।
ম্যাচ শেষে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার হাতে নিয়ে কান্নার কারণ জানালেন ভোজিনহা। ‘আমি কেঁদেছি কারণ আমি বড় হয়েছি আমার দাদা-দাদির কাছে। দুর্ভাগ্যবশত তারা আজ বেঁচে নেই। আর কেঁদেছি আমার মায়ের জন্য। ভিসার জন্য যে বিপুল পরিমাণ টাকা বন্ড হিসেবে জমা দিতে হয়, তা সময়মতো জোগাড় করতে না পারায় মা আজ গ্যালারিতে থাকতে পারেননি।’ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কেপ ভার্দের নাগরিকদের ভিসার জন্য প্রায় ১৫ হাজার ডলার বন্ড দিতে হয়, যা এই ফুটবলারের পরিবারের পক্ষে সময়মতো দেওয়া সম্ভব ছিল না।
ভোজিনহার এই রূপকথার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ লড়াই ও উত্থানের গল্প। কেপ ভার্দের ছোট্ট দ্বীপ মাইন্ডেলোতে জন্ম নেওয়া এই গোলরক্ষকের আসল নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। শৈশবে বাবা সামরিক বাহিনীতে থাকায় এবং মা দীর্ঘ সময় কাজ করায় দাদা-দাদির কাছেই কেটেছে তার শৈশব। পাড়ার বড় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলার সময় চোট পেয়ে রাগ করে বাড়ি ফিরে গেলেই বন্ধুরা ক্ষেপাত যা গিয়ে সে দিদিমার কাছে নালিশ করত। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় ভোজিনহা, পর্তুগিজ সেই শব্দ বাংলায় অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘ছোট্ট দিদিমা’।
দ্বীপের সেরা গোলরক্ষক হওয়া সত্ত্বেও কম উচ্চতার কারণে শুরুতে অবহেলার শিকার হয়েছেন ভোজিনহা। ২৫ বছর বয়সের আগে পেশাদার ফুটবল শুরুই করতে পারেননি। একপর্যায়ে জাতীয় দল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও বিশ্বকাপের স্বপ্ন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এরপর সুযোগের সন্ধান ও জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান পর্তুগালে। সেখান থেকে অ্যাঙ্গোলা, সেøাভাকিয়া, মলদোভা এবং সাইপ্রাসের মতো বিভিন্ন দেশের অখ্যাত সব ক্লাবে যাযাবর জীবন কাটিয়ে এখন খেলছেন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব চাভেসে।
এদিকে এই বুড়ো বাজপাখির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার এক অদ্ভুত সংযোগ। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার সতীর্থ হোর্হে ভালদানো ৪টি গোল করে কেপ ভার্দের এক ফুটবল পাগল মানুষকে (ভোজিনহার বাবা) এতটাই মুগ্ধ করেছিলেন যে, তিনি তার নবজাতক ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ‘ভালদানো’। কিন্তু কেপ ভার্দের নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি নাম রাখার অনুমতি না থাকায়, সরকারি রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা নামটি বাতিল করে দেন। বাধ্য হয়ে সেই বাবা তার দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে বেছে নেন সে বছরই ব্রাজিলের হয়ে কাঁপানো ডিফেন্ডার ‘জোসিমার’-এর নাম। যুগের পরিক্রমায়, ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সেই জোসিমার ওরফে ভোজিনহা নিজেই এক নতুন ইতিহাস গড়লেন।