পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সংসদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন রোহিঙ্গার মধ্যে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জন ব্যক্তিকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে মিয়ানমার।
তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত ছয়টি ধাপে মোট ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের নিকট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার এযাবৎ ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন করেছে।
আর ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জন ব্যক্তিকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনও দেশে পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।
বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের এ তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
শাহজাহান চৌধুরী লিখিত প্রশ্নে জানতে চান ২০২৪-২৫ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কী অগ্রগতি হয়েছে, প্রত্যাবাসন শুরুর সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কী? প্রতিদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেই নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে তা মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
জবাবে ড. খলিলুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি অত্যন্ত জটিল মানবিক সংকট। প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সহিংসতার জের ধরে বিগত ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং কক্সবাজার জেলায় স্থাপিত ক্যাম্পসমূহে আশ্রয় নেয়। এরপরেও বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে-ছোট ছোট দলে-মিয়ানমারের চলমান জাতিগত সহিংসতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এই ক্যাম্পসমূহে আশ্রয় নিয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ সময়কালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনায় কী অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিলো? এপ্রসঙ্গে আমি মহান জাতীয় সংসদকে জানাতে চাই যে, অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই-রিপ্রেজেন্টাটিভ হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করেছি। সেসময়ে রোহিঙ্গা সমস্যার আশু সমাধানের লক্ষ্যে আমরা দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক-সব ফ্রন্টেই অত্যন্ত জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিলাম। এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, অতীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কোনও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বরং এই নির্যাতিত বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মানবিক বিপর্যয়ের চিত্রকে পুঁজি করে দাতা দেশগুলো থেকে কেবল আর্থিক সহায়তা চেয়েছে আর রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশার গল্পকে সামনে এনে নিজের জনগণের ওপরে তাদের চালানো অত্যাচার- নিপীড়ন ও দুর্নীতির খতিয়ান থেকে বহির্বিশ্বের দৃষ্টি সরিয়ে ফেলার অপচেষ্টা চলেছে। এর কারণে এই ইস্যুটি আন্তর্জাতিক এজেন্ডা থেকে স্থানচ্যুত হয়ে গিয়েছিল। ফলতঃ ফ্যাসিস্ট সরকারের অনিচ্ছার কারণেই আজ এই রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল ও দীর্ঘ মেয়াদি রূপ লাভ করেছে।
মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই ইস্যুকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় নিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুইতেরেজ-কে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। এই আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করেন এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময়ে ইফতারের জন্য সমাগত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীরা দ্রুততম সময়ে নিজভূমে ফিরে যাবার তীব্র ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কক্সবাজারে দেশিয় ও বৈদেশিক অংশীজনদের নিয়ে একটি বিশেষ স্টেকহোল্ডার কনফারেন্স আয়োজন করা হয়। এই কনফারেন্সে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুনিদিষ্ট ৭টি দাবি উত্থাপন করা হয়, যা পরবর্তীতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে (ইউনাইটেড নেশনস জেনারেল অ্যাসেম্বলি (ইউএনজিএ)-সহ অন্যান্য ডিপ্লোম্যাটিক ফোরামে এই ইস্যুতে আলোচনার একটি জোরালো প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের উদ্যোগে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি দিনব্যাপী বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যা রোহিঙ্গা সংকটকে নতুনভাবে গ্লোবাল হিউম্যানিটেরিয়ান ডিবেটের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই জোরালো কূটনৈতিক প্রয়াসের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর সর্বসম্মতিক্রমে একটি ঐতিহাসিক রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে। ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথভাবে উত্থাপিত এই রেজুলেশনটিতে বিশ্বের ১০৫টি দেশ কো-স্পন্সর করে, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে অবতীর্ণ হতে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও সসম্মানে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনে কার্যকর বৈশ্বিক প্রচেষ্টা জোরদার করণের আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির মূল কারণগুলো আমলে নিয়ে জাস্টিস ও অ্যকাউন্টিবিলিটি নিশ্চিত করার ওপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। সেলক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস এ গাম্বিয়ার করা মামলায় বাংলাদেশ সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসলে এবং আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে আমাদের কূটনৈতিক প্রয়াস আরও শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দ্বিপাক্ষিক ফ্রন্টে রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতির বাস্তবতায় আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলমান। প্রত্যাবাসনের মূল ভিত্তি হিসেবে রোহিঙ্গা তথ্য যাচাইকরণ বা ভ্যারিফিকেশনের কাজ নিয়মিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত ৬টি ধাপে মোট ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের নিকট প্রেরণ করেছে, যার মধ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এযাবৎ ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন করেছে এবং ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জন ব্যক্তিকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনও দেশে পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।
৫৭১২ আইওএম ও আইআরসি’র মাধ্যমে ৬৯৭ জন উন্নত দেশে পুর্নাবাসন
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইওএম এবং ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)-এর সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এযাবৎকাল পর্যন্ত সর্বমোট আইওএম-এর মাধ্যমে ৫ হাজার ৭১২ জন রোহিঙ্গাকে এবং আইআরসি-এর মাধ্যমে ৬৯৭ জন রোহিঙ্গাকে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সফলভাবে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়েছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-এপ্রিলের মধ্যেই আইওএম-এর মাধ্যমে ১৯১ জন রোহিঙ্গাকে কানাডা, যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডে এবং আইআরসি-এর মাধ্যমে ১৪৫ জন রোহিঙ্গাকে অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসন করা হয়েছে। তবে, আমরা মনে করি এটি কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। বরং রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও তৎসংলগ্ন এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করার লক্ষ্যে গঠিত ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ কক্সবাজার জেলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বিশেষ টাস্ক ফোর্স’ দিনরাত নিরলসভাবে যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে একটি সুনিদিষ্ট ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর আওতায় আনতে ‘বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিক (এফডিএমএন) ক্যাম্পসমূহের নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস’ প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের এই সকল সময়োপযোগী ও সুবিন্যস্ত পদক্ষেপের ফলে ক্যাম্পে খুন, গুম, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে খুনের ঘটনা ছিল ৬৬টি, ২০২৪ সালে তা ৪৯টি এবং ২০২৫ সালে তা কমে ৩৫টিতে নেমে এসেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিনমাসে এই সংখ্যা মাত্র ৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
হজের খরচ আগামী বছর আরও কমানো হবে: প্রধানমন্ত্রী