তারল্য সহায়তায় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০৬ এএম

আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ধারাবাহিকভাবে তারল্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন পর্যন্ত ব্যাংকটিকে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে নতুন অর্থ সরবরাহ মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এ বিষয়টি স্বীকার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে।

গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নানা বিতর্ক এবং আর্থিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের কারণে আমানতকারীদের একাংশের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অনেক গ্রাহক একযোগে আমানত তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে ব্যাংকটি তারল্য সংকটে পড়ে। এ অবস্থায় গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধে সক্ষমতা বজায় রাখতে এবং আস্থার সংকট ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘‘কোনো ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া হলে সেটিকে শুধু ‘টাকা ছাপানো’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে নতুন অর্থ সৃষ্টির ফলে অর্থ সরবরাহ বাড়ে, আর এর বিপরীতে উৎপাদন বা পণ্য-সেবার সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।’’

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপকহারে আমানত উত্তোলনের প্রবণতা দেখা দেয়। সব গ্রাহক একসঙ্গে টাকা তুলতে এলে পৃথিবীর কোনো ব্যাংকের পক্ষেই তাৎক্ষণিকভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্ব থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, সাময়িক এই সহায়তার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবে এবং আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেবে। তখন বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রভাবও কমে আসবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা মূলত নতুন অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে দেওয়া হয়। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ বাড়ে। সহায়তা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে বা অর্থ দ্রুত প্রত্যাহার করা না গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে সহায়তাটি সাময়িক হওয়া জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হলে তা অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় একটি ব্যাংক সংকটে পড়লে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা থাকে না। এতে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থার প্রভাব পড়তে পারে। তাই অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য সহায়তা দিতে হয়। তবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা, অন্যদিকে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা। ইসলামী ব্যাংককে দেওয়া সহায়তা কত দ্রুত ফেরত আসে এবং ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার কতটা উন্নতি হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সহায়তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত