ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মেশিন প্রায় দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে বায়োকেমিস্ট্রি মেশিনটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এবং রাসায়নিক উপাদান (রিএজেন্ট) সংকটের কারণে দুটি হেমাটোলজি অ্যানালাইজার মেশিন অচল হয়ে আছে।
মেশিনগুলো বন্ধ থাকায় প্রতিদিন অসংখ্য রোগী লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা, ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পারছেন না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বন্ধ থাকা বায়োকেমিস্ট্রি মেশিনের মাধ্যমে রক্তে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান, এনজাইম ও লবণের মাত্রা পরীক্ষা করা হতো। এ যন্ত্রের সাহায্যে লিভার ফাংশন টেস্ট (এলএফটি), কিডনি ফাংশন টেস্ট (কেএফটি), রক্তে শর্করার মাত্রা, ইউরিক অ্যাসিড, কোলেস্টেরলসহ ১৫ থেকে ২০ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা যেত।
অন্যদিকে হেমাটোলজি অ্যানালাইজার মেশিনে সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হতো। সরকারি হাসপাতালে এসব পরীক্ষা ৫০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে করা যেত। বর্তমানে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে এসব পরীক্ষা করাতে রোগীদের পাঁচ থেকে ১০ গুণ বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেকেই অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পারছেন না।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সদর উপজেলার শাহিনা বেগম বলেন, ‘ডাক্তার কিডনির পরীক্ষা দিয়েছেন। হাসপাতালে এসে শুনি মেশিন বন্ধ। বাইরে পরীক্ষা করাতে গিয়ে প্রায় এক হাজার টাকা খরচ হয়েছে।’
রাণীশংকৈল উপজেলার শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘লিভারের পরীক্ষা করা দরকার ছিল। হাসপাতালে হলে অল্প টাকায় হতো। বাইরে গিয়ে কয়েক গুণ বেশি খরচ হয়েছে।’
ঠাকুরগাঁও শহরের দিনমজুর জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘ডাক্তারের দেওয়া সব পরীক্ষা করাতে পারিনি। টাকার অভাবে কিছু পরীক্ষা বাদ দিতে হয়েছে।’
হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের টেকনোলজিস্ট আবদুস সালাম বলেন, ‘গত দেড় থেকে দুই মাস ধরে তিনটি মেশিন বন্ধ রয়েছে। কোনোটি রিএজেন্ট সংকটে, আবার কোনোটি যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে চালু করা যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে টেকনোলজিস্টদের হাতে সিবিসি পরীক্ষা করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে হেমাটোলজি অ্যানালাইজার মেশিনে মাত্র দুই মিনিটে নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়।’
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব ইনচার্জ) ফনিন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, ‘প্রতিদিন রোগীরা বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য আসছেন। কিন্তু মেশিন বন্ধ থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় রোগীরা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অধিকাংশ আধুনিক মেডিকেল যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ক্যালিব্রেশন ও কারিগরি তদারকির প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার বা টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে এসব যন্ত্রের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে ছোটখাটো ত্রুটিও বড় সমস্যায় রূপ নিয়েছে।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, ‘বায়োকেমিস্ট্রি মেশিনটি টেকনিশিয়ান পরীক্ষা করে নতুন মেশিন কেনার পরামর্শ দিয়েছেন। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আর হেমাটোলজি অ্যানালাইজার দুটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট সরবরাহে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে জানানো হয়েছে।’
তবে কবে নাগাদ মেশিনগুলো সচল হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি তিনি।