গাইবান্ধার ছাত্র শিবির নেতা হত্যার বিচার চায় পরিবার

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

‘ছোট বেলা থেকে হামার ব্যাটা শান্ত। হামার ব্যাটা কি দোষ করছিল। তাকে ওরা এভাবে হত্যা করলো। আমার বুক খালি করলো। তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দেও বাবা। হামি ক্যামনে একা থাকমো। এভাবে মানুষ মানুষকে মারে। হত্যাকারীদের তোমরা ফাঁসি দাও। হামি ওদের বিচার চাই’।

আজ সোমবার বিকেলে এভাবেই বিলাপ করছিলেন নিহত ছাত্র শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারীর মা শাহারা বানু। তাঁর মৃত্যুর খবরে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনেরা ভিড় করছেন। সবাই সাইফুল্লাহ স্মৃতি হাতড়ে কান্নাকাটি করছিলেন। আজ দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের শিমুলতাইড় গ্রামে সাইফুল্লাহ বারীর বাড়িতে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়।

শিবির নেতা সাইফুল্লাহ ওই গ্রামের মোয়াজ্জিন হাবিবুর রহমানের ছেলে। তিনি বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন। গত ২১ জুন রবিবার বিকেলে উপজেলার বোনারপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত হন তিনি। 

সাইফুল্লাহ বারী মায়ের আহাজারির সময় পাশেই ছিলেন তাঁর দুই বড় বোন হাজেরা আকতার ও শরিফা বেগম। তারা বলেন, গতকাল আমরা বাবার বাড়িতে আসি। সাইফুল্লাহ বাড়িতে ছিল। বাবা ও বড় ভাইয়ের সাথে দুপুরের খাবার খাচ্ছিল। বেলা ২ টার পর সাইফুল্লাহর একটি ফোন আসে। মা তখন আম কাটছিল। সবাই খাবো বলে। ফোন পেয়ে সে দ্রুত খেয়ে বোনারপাড়া বাজারে যায়। যাওয়ার সময় মাকে বলে যায়, মা তুমি,আমার জন্য কেটে রাখো, একটু পর এসে খাচ্ছি। তার কিছুক্ষণ পর অর্থাৎ বেলা ৩ টার দিকে খবর পাই, ওকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। চারমাথায় রাস্তার ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। বড় বোন হাজিরা আকতারের দাবি, সুপরিকল্পিতভাবে সাইফুল্লাহকে মারা হয়েছে। আমার ভাই সৎ মানুষ। কারো সাথে কোন ঝামেলা ছিল না তার।  

নিহত সাইফুল্লাহ বারীর বাবা হাবিবুর রহমান। তিনি স্থানীয় একটি মসজিদে মোয়াজ্জিন হিসেবে চাকরি করেন।কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখি সাইফুল্লাহ বাজারের চারমাথায়। পরে সেখানে এগিয়ে যাই। জানতে পারি এক শিক্ষককে যুবদলের মুকুল ও তার ভাইরা অবরুদ্ধ করে রাখছে। আমার ছেলে তার প্রতিবাদ করছে। এক পর্যায়ে ছেলে আমাকে বলে, আব্বা তুমি যাও এখানে সমাধান হয়েছে। কোনো ঝামেলা হবে না। আমি মসজিদে চলে আসি। তার একটু পরই আমার বড় ছেলে ফারুক দৌড়ে এসে বলে,আব্বা সাইফুল্লাহকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। দ্রুত তাকে হাসপাতাল নেওয়ার পথেই ছেলে আমার মারা যায়।

তিনি বলেন-হত্যাকারীদের এমন শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে আমার মতো আর কেউ সন্তান হারানোর যন্ত্রনা সইতে না হয়।

এ সময় উঠানে আহাজারি করছিলেন সাইফুল্লার বড় ভাই ফারুক আহমেদ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল আগে থেকে ওৎ পেতে ছিল। আমার ভাই কোন দোষ করেনি। খুনিরা প্রকাশ্যে দিনের আলোয় ভাইকে দুনিয়া থেকে তুলে দিলো।  আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। জড়িতদের ফাঁসি চাই। 

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাঘাটার উপজেলার কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনের বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা চত্বরে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক হাবিবুল্লার সাথে বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়কের মুকুলের কথার কাটাকাটি হয়। পরে স্থানীয় নেতাদের সমঝোতায় বিষয়টি মীমাংসা হয়। এরপর উপজেলা চত্বর থেকে সবাই চলে যায়।

এ ঘটনার কয়েক মিনিট পর উপজেলার বোনারপাড়া চৌরাস্তা মোড়ে ওই শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখে মুকুল ও তার লোকজন। পরে নিহত ছাত্র শিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ ও শিবির কর্মী সালাউদ্দিন ওই শিক্ষককে ছেড়ে দিতে বলেন। এসময় সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মুকুল মিয়া ও তার ছোট ভাই পলাশ, বোনারপাড়া ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য রবিউল ইসলাম, যুবদল নেতা আশরাফ, যুবদল নেতা মোনারুল ও জব্বারসহ ১০/১৩ জন ধারালো অস্ত্র নিয়ে শিবির কর্মী সালাউদ্দিনের ওপর হামলা করে। এসময় হামলাকারিরা সালাউদ্দিনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় আঘাত করে। এসময় বোনারপাড়া ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি এগিয়ে আসলে তাকে ধাওয়া করে বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনের রাস্তার উপর ফেলে গলায় আঘাত করে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা আহত দুজনকে উদ্ধার করে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে শিবির নেতা সাইফুল্লাহকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। 

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুর রহমান জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের আটক করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার প্রক্রিয়া চলছে। 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত