চট্টগ্রামে নিহত গাইবান্ধার রানা ও খোকনের বাড়িতে আহাজারি

অভাবের কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি রানা শ্রমিকের কাজ করতেন। 

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৬ পিএম

‘হামার ব্যাটা ডিসি অফিসোত চাকরির আবেন করচিলো। দুইদিন আগোত হামাক জানাচে মা, পরিক্ষে দেওয়ার জন্নে বাড়িত আসপ্যার চাচিলো। বেতন পামো,সেই ট্যাকা নিয়া বাড়িত আসমো। ব্যাটা হামার বাড়িত আসলো লাশ হয়া। হামারঘরের সবকিচু শ্যাস হয়া গেলো। মাও বাপের সুখের জন্য দুনাত থাক চলি গেল। সুখের আসায় ব্যটাক হারালাম। হামরা একন কাকে নিয়া বাচমো।’

আজ শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে এভাবেই নিজের ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামে জাহাজের ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ গাইবান্ধার পশ্চিম কুপতলা গ্রামের নিহত রানা মিয়ার (২৩) মা মনোয়ারা বেগম (৫৫)। 

এ সময় তার পাশে দাড়ানো নিহত রানার বোন পিংকি রাণী আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের গরীব মানুষের জীবনের কোনো মুল্য নাই। আপনারা ছবি তুলে পেপারে দেন। পরে আর কোন কাজ হয়না। বিচার হয়না। এভাবে কত মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেল। তার বিচার হয় না।      

নিহত রানা মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুপতলা ইউনিয়নের পশ্চিম কুপতলা গ্রামে।  তিনি ওই গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। গতকাল শুক্রবার খোকনের পরিচিতরা তার পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানায়।

আজ শনিবার সকাল ১০টায় অ্যাম্বুলেন্সযোগে রানা মিয়ার মরদেহ পশ্চিম কুপতলায় তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে। 

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দুরে পশ্চিম কুপতলা গ্রাম। দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, মরদেহ পৌছার পর থেকে নিহতের বাবা-মা এবং স্বজনরা আহাজারি করছে। তাকে দেখতে গ্রামের মানুষ তার বাড়িতে ভীড় জমিয়েছে। আশপাশের লোকজন নিহত রানার বাবা-মাকে সান্তনা দিচ্ছে।

পারিবারিক সুত্র জানায়, রানা মিয়া ২০২১ সালে পশ্চিম কুপতলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। এরপর কোন কর্ম না পেয়ে তিনি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় শ্রমিকের চাকরি নেন।

অভাবের কারণে লেখাপড়া করার পাশাপাশি রানা কখনো প্রাইভেট ও আবার কখনো শ্রমিকের কাজ করতেন। রানা মিয়ার বড়ভাই মোনারুল ইসলাম (৩০) চট্টগ্রামের অন্য কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেখানে স্ত্রী মিশু খাতুনকে (২৫) নিয়ে তিনি বসবাস করেন। তাদের দুই মেয়ে মোচফান (৩) ও মেহজাবিন ( ১)। তারা গ্রামের বাড়িতে দাদা দাদির কাছে থাকে। একমাত্র বোন পিংকি রাণীর বিয়ে হয়েছে। নিহত রানার আয় দিয়ে তার মা-বাবার সংসার চলত।

রানা মিয়ার বড়ভাই মোনারুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে ছোটভাইয়ের মরদেহের সাথে বাড়িতে আসেন। তিনি বলেন, ছোটভাই রানা গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। আগামি ২১ আগষ্ট লিখিত পরীক্ষা হবে-এজন্য সে মেসেজ পেয়েছে বলে আমাকে মৃত্যুর দুইদিন আগে জানায়। লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এ সপ্তাহে বেতন নিয়ে রানার বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। বাড়িতে আসলো লাশ হয়ে। 

ভেবেছিলাম, দুই ভাই মিলে সংসারের অভাব দূর করবো। সেজন্যে তাকে ২০২৩ সালের দিকে চট্টগ্রাম নিয়েছিলাম। ও (রানা) যে কোম্পানিতে চাকরি করত সেখানে কোনো নিরাপত্তা ছিল না। ঝুঁকি নিয়ে টাকার আসায় কাজ করতো সে। এসময় তিনি কোম্পানির কাছে ক্ষতিপুরণ দাবি করেন।

রানার বাবা হারুন অর রশিদ চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, আমি অসুস্থ মানুষ। আমাদের কোন জমিজমা নেই। ছেলের টাকায় আমার চিকিৎসা চলতো। এখন আমার ছেলে নাই। এই বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এদিকে চট্টগ্রামের একই ঘটনায় নিহত হন গাইবান্ধার খোকন মিয়া (২৬)। তার বাড়ি গাইবান্ধার কিশামত হলদিয়া গ্রামে। গ্রামটি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের অন্তর্গত। নিহত খোকন মিয়ার বাবা বর্গাচাষী মো. রানা মিয়া (৫৮)। বর্গাচাষী রানা মিয়া নিজের ভাষায় বলেন, ‘মানসের জমি আদি করি। তাক দিয়ে সোংসারোত চলে না। ম্যালা অভাব। ব্যাটার ট্যাকা দিয়া অবাব মিটানো, তাক হলো না। হামার ব্যাটার ক্ষতি হামরা কেমন করি পোসামো’।

এ সময় খোকনের মা উর্মি বেগম (৫৪) আহাজারি করে বলেন, হামরা কিচু বুজি নে। তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দাও বলে অজ্ঞান হয়ে যাচ্চেন।

নিহত খোকন মিয়ার পারিবারিক সূত্র জানায়, কিশামত হলদিয়া গ্রামের এক বর্গা চাষী রানা মিয়া ছোট ছেলে খোকন। খোকনের স্ত্রী দুই বছরের এক সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। প্রায় ছয় মাস আগে খোকন চট্টগ্রামে জাহাজ কোম্পানির চাকরিতে যান। গতকাল শুক্রবার খোকনের পরিচিতরা তার পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানায়।

শনিবার সকাল ১১টায় কিশামত হলদিয়া গ্রামে তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে সকালে অ্যাম্বুলেন্সযোগে খোকন মিয়ার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌছে। মরদেহ পৌছার পর তার বাবা-মা এবং স্বজনরা আহাজারি করে। তাকে দেখতে গ্রামের মানুষ তার বাড়িতে ভীড় জমায়।  

গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছড়িয়ে পড়া ‘বিষাক্ত গ্যাসে’নয়জন নিহত হয়েছেন। ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় নয়জন শ্রমিক নিহত হন। তারা হলেন, সানি জলদাস (২৩), পলাশ জলদাস (৩৫), হাবিবুর রহমান (৫১), মোহাম্মদ মনসুর (৫৫), নাসির উদ্দিন (৫১), আবদুল আলীম (৩৬), রানা মিয়া (২৩), মতিউর রহমান (১৯) ও খোকন মিয়া (২৩)। তাদের মধ্যে খোকন ও রানার বাড়ি গাইবান্ধায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত