ঘোলা পানিতে পলি, নাব্য হারানোর শঙ্কা বাড়ছে

আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

তিস্তা নদীতে উজান থেকে নেমে আসা প্রবাহিত পানি এখন ঘোলা কাদামাটি যুক্ত। নদীপারের মানুষজন বলছেন ঘোলা পানির কারণে বোঝা যাচ্ছে উজান থেকে পলি বয়ে আনছে তিস্তায়। যার প্রভাবে নাব্য আরও কমে যাবে, সংকট বাড়বে। এমনিতেই উজানের পলিতে ভরাট হয়ে আছে নদীর বুক। ফলে দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ভাঙন, সমতলে নদীর পানি উপচে প্রবেশ করে ফসলি জমি, পথঘাট ও বসতঘর তলিয়ে দিচ্ছে।

তিস্তা নদী ভারতের জলপাইগুড়ির মেখলিগঞ্জ হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারীর ডিমলার পূর্বছাতনাই ইউনিয়নে কালীগঞ্জ জিরো পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীর ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ অববাহিকার ১১৫ কিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে।

শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়। অনেক স্থানে হেঁটে নদী পারাপার হন স্থানীয়রা। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, প্রতিবছর দুই কোটি টনের বেশি পলি আনছে তিস্তা। এতে নদীর ধারণ ক্ষমতা কমছে।

তিস্তাপাড়ের মানুষজন পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে জানান, ২০২৩ সালে ভারতের সিকিমের প্রবল বন্যার পর তিস্তায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এবার তিস্তা নদী বর্ষার শুরুতেই যেন গর্জে উঠে রুদ্রমূর্তির ধারণ করেছে। গত রবিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর আগের দিন শনিবার ছিল বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে। তিস্তার পানি প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বর্ষার শুরুতেই রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মহিপুর তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এলজিইডির ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বসানো বাঁশের পাইলিং ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুসহ রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক।

২০ জুন সন্ধ্যা থেকে সেতুটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। এতে হুমকির মুখে পড়েছে দুই জেলার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রতিদিন মহিপুরের তিস্তা সড়ক সেতু দিয়ে অন্তত ৩০-৩৫ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। হঠাৎ ভাঙনে আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কাসহ লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের তিন গ্রামের ১ হাজারের বেশি পরিবার সরাসরি হুমকির মুখে রয়েছে।

নদীপাড়ের মানুষজন আরও জানান, এবার তিস্তার রূপ ভাল ঠেকছে না। বন্যার সময় ঘোলাটে পানির স্রোতে পলি আসার কারণে তিস্তা নদীর বুকে ইতিমধ্যেই নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। পলি আসা অব্যাহত থাকায় চরগুলো ক্রমশ উঁচু হচ্ছে। পলিতে নদীর বুক উঁচু হওয়ায় স্বল্প পানিতেই নদী টইটম্বুর হয়ে পড়ে। পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। চাষাবাদ, পথঘাট, ঘরবাড়ি সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নীলফামারীর ডালিয়ার বাইশপুকুর এলাকার রাশেদ কাজী বলেন, নদীর ঘোলা পানির সঙ্গে মাটিও আসতেছে। নদীর তলদেশ ভরে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমের সময় এই মাটি দেখা যায়। নদী ভরে যাওয়ায় পানি বাড়লেই বন্যা সৃষ্টি হয়। ডিমলার পূর্বছাতনাই এলাকার হারুন মাঝি বলেন, আগে নদীর গভীরতা অনেক বেশী ছিল। বড় বড় নৌকা যাতায়াত করত। এখন তো নদীর গভীরতা নেই।

তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানি বলেন, ভারত থেকে ধেয়ে আসা উজানের ঢলে রংপুর অঞ্চলের তিস্তা অববাহিকায় প্রায়ই অসময়ে বন্যা হচ্ছে। খরাকালে গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে শুকনো মৌসুমে পানি আটকে রাখে ভারত। আবার একটু পানি বেশি হলেই বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়ে গজলডোবার গজবে ভাসাচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষদের। এতে প্রতিবছর ব্যাপক ফসলহানি ঘটছে। হুমকিতে পড়ছে খাদ্যনিরাপত্তা। নদীভাঙনে বাড়ছে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা, বাড়ছে রংপুর বিভাগে গড় দারিদ্র্যের হার। তিনি আরও বলেন, আন্তঃদেশীয় ব্যবস্থাপনায় তিস্তা অববাহিকার ভারত-বাংলাদেশ মিলে নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারা, নদী খনন না করা, ভাঙন রোধে কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে না পারায় তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের ১১৫ কিলোমিটারে বসবাসরত দুই কোটি মানুষের জীবনে মহাদুর্যোগ নেমে এসেছে।

নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ২৩৯ বছর আগে তৈরি হওয়া এ নদীর আজ অবধি কোনো পরিচর্যা করা হয়নি। বরং দফায় দফায় এ নদীর সর্বনাশ করার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে যে নদী হয়ে ওঠার কথা ছিল উত্তরের জীবনরেখা, সেটা হয়ে উঠেছে অভিশাপ।

তিনি আরও বলেন, উত্তরের জীবনরেখা তিস্তা নদী। এটি নিয়ে এখন পর্যন্ত যৌথ কোনো সমীক্ষা হয়নি। তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে পানি আসে না। বর্ষার সময়  প্রতিবছর উজানের ঘোলা পানির সঙ্গে আসা পলি, ময়লা-আবর্জনায় তিস্তার বুক ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এখন আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নদী ড্রেজিং করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত