ভোলার চরফ্যাশন থেকে মাছ ব্যবসায়ীদের কেনা কোটি টাকা মূল্যের ১০ হাজার ১৪০ কেজি ইলিশ মাছ গায়েবের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশনা এসেছে উচ্চ আদালত থেকে। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার নিচে নন এমন বিচারকের মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে হাইকোর্ট। প্রতিকার চেয়ে ১০ মাছ ব্যবসায়ীর করা রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল সোমবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. ছিদ্দিক উল্যাহ মিয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ফারুক হোসেন। অ্যাডভোকেট সিদ্দিক উল্যাহ মিয়া হাইকোর্টের আদেশের বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেন।
‘ভোলায় জব্দ ইলিশ গায়েব’ শিরোনামে গত ২০ মে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন রিট আবেদনের সঙ্গে করে এ মামলাটি করা হয়। এতে ইলিশ মাছের ক্রয় মূল্য ৯৪ লাখ ২ হাজার ৭৮৪ টাকা এবং ইলিশ মাছ জব্দকারী কোস্ট গার্ডের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মাছের মূল্য ১ কোটি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোলার চরফ্যাশন থেকে ব্যবসায়ীদের বৈধভাবে ক্রয় করা কোটি টাকার ইলিশ ঢাকায় পরিবহনের পথে জব্দ করা হয়। পরে মাদ্রাসা ও এতিমখানায় কিছু মাছ বিতরণের নামে বেশিরভাগ মাছ লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। এতে আরও অভিযোগ করা হয়, জব্দের পর ওই মাছের একটি অংশ বরিশালে নিয়ে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। জেলা শহরের কালিনাথ বাজার এলাকায় তিনটি ট্রাকে ১৫৫টি ককসিটে বোঝাই বড় আকারের ইলিশ মাছ জব্দ করে কোস্ট গার্ড দক্ষিণ জোনের অপারেশন টিম।
ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে ইলিশ মাছ সাগরের নাকি নদীরএটি বিশেষজ্ঞরা নির্ধারণ করতে পারবেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মৎস্য বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইন জানান, ইলিশ মাছ সাগরের নাকি নদীর তা স্বাভাবিকভাবে আলাদা করা যায় না। গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে উপকূলে আনার পথে জব্দ হলে তা সাগরের মাছ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন ছিল। স্থলপথ থেকে এসব মাছকে সাগরের মাছ হিসেবে জব্দ করা মৎস্য আইনের পরিপন্থি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গভীর সাগরে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ওই সময় সামুদ্রিক মাছ আহরণ বন্ধ রাখার বিধান রয়েছে। কোস্ট গার্ড ওই ইলিশকে সামুদ্রিক মাছ উল্লেখ করে জব্দ করে। তবে মাছ ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, এসব মাছ নদী ও মোহনা থেকে ধরা হয়েছে। কোস্ট গার্ড দপ্তরে ইলিশ ক্রয় ও নদীর মাছ এ সংক্রান্ত প্রমাণপত্র উপস্থাপন করা হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার ১২ মে স্বাক্ষরিত এক অনুমতিপত্রে দেখা যায়, মাছ পরিবহনের আগে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। সামরাজের ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেনের আবেদনের পর ইলিশ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের সহকারী মো. আল-আমিন হোসেন যাচাই-বাছাই করে পরিবহনের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেন।
অন্যদিকে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের সুষ্ঠু প্রজনন, উৎপাদন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভোলা কোস্ট গার্ড ও মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সন্দেহজনক ১ কোটি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ হাজার ১৪০ কেজি সামুদ্রিক ইলিশ মাছ জব্দ করা হয়।
রিটকারীদের আইনজীবী ছিদ্দিক উল্যাহ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, যখন ইলিশ মাছগুলো জব্দ করা হয়, তখন মাছ ধরায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। জেলেদের কাছে মাছ ধরার অনুমতিপত্র ছিল। তিনি বলেন, ‘যে প্রক্রিয়া মাছগুলো জব্দ করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। আর কোটি টাকার জব্দ করা মাছের পুরোটাই এতিমখানায় দিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও মিথ্যা। আদালত আমাদের বক্তব্য শুনে বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।’