পরকালে ভালো ও মন্দ কাজের ওজন হবে

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

মানুষের দুনিয়ার জীবন একদিন শেষ হবে। তারপর শুরু হবে আখিরাতের অনন্ত জীবন। সেই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো মানুষের আমলের হিসাব এবং তা ওজন করা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন ওজন হবে যথাযথ। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি (অস্বীকারের মাধ্যমে) জুলুম করত।’ (সুরা আরাফ ৮-৯)

কেয়ামতের দিন প্রতিষ্ঠিত হবে পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার। সেখানে কারও প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করা হবে না। মানুষের প্রতিটি কাজ, তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। ফলে কারও প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না। কারও কাজ যদি সরিষা দানা পরিমাণও হয়, তবুও আমি তা উপস্থিত করব।’ (সুরা আম্বিয়া ৪৭)

আখিরাতের সেই দাঁড়িপাল্লায় মানুষের ভালো ও মন্দ আমল ওজন করা হবে। যাদের নেক আমলের পাল্লা ভারী হবে তারা হবে সফল ও সৌভাগ্যবান। অন্যদিকে যাদের পাপের পাল্লা ভারী হবে, তারা নিজেদের জন্য ধ্বংস ডেকে আনবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যার পাল্লা ভারী হবে, সে থাকবে সন্তোষজনক জীবনে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার স্থান হবে হাবিয়া নামক জাহান্নামে।’ (সুরা কারিয়া ৬-৯)

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমল তো কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়, তাহলে তা কীভাবে ওজন করা হবে? এর উত্তর হলো, আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে সক্ষম। কেয়ামতের দিনের বাস্তবতা দুনিয়ার নিয়মের মতো হবে না। ইসলামি স্কলাররা এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, আল্লাহ আমলগুলোকে এমন রূপ দেবেন যা ওজন করা সম্ভব হবে। কেউ বলেছেন, আমলনামা ওজন করা হবে। আবার কেউ বলেছেন, আমলকারীকেই ওজন করা হবে। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেছেন, এসব মতের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব। অর্থাৎ কখনো আমল, কখনো আমলনামা এবং কখনো আমলকারীকে ওজন করা হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বহু হাদিসে আমল ওজনের বিষয়টি এসেছে। তিনি বলেছেন, ‘দুটি বাক্য উচ্চারণে খুবই হালকা, কিন্তু দাঁড়িপাল্লায় অত্যন্ত ভারী এবং রহমানের কাছে খুবই প্রিয়। তা হলো, ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।’ (সহিহ বুখারি)

অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘আমলের ওজনের ক্ষেত্রে উত্তম চরিত্রের সমান ভারী আর কোনো আমল নেই।’ (সুনানে আবু দাউদ)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দাঁড়িপাল্লায় তার ওজন ওহুদ পাহাড়ের চেয়েও বেশি হবে। (মুসনাদে আহমাদ)

এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আল্লাহর কাছে মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার বাহ্যিক অবয়ব বা দুনিয়াবি অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না, বরং ইমান, তাকওয়া ও নেক আমলের ওপর নির্ভর করে।

মহান আল্লাহ ন্যায়বিচারকারী। তিনি কারও নেকি কমিয়ে দেন না। বরং তিনি বান্দার নেক আমলকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। আর কোনো পুণ্য কাজ হলে তিনি সেটাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে মহাপুরস্কার দান করেন।’ (সুরা নিসা ৪০)

তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান মনে করা। ছোট নেক আমলকেও তুচ্ছ না ভাবা এবং ছোট পাপকেও অবহেলা না করা। কারণ কেয়ামতের দিন প্রতিটি কাজের হিসাব হবে এবং সবকিছু ওজন করা হবে। সেদিন প্রকৃত সফলতা হবে নেক আমলের পাল্লা ভারী হওয়ার মাধ্যমে।

আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু এর প্রতিটি কাজের ফল চিরস্থায়ী। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো এমন আমল করা, যা কেয়ামতের দিন আমাদের আমলের পাল্লাকে ভারী করবে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পথে নিয়ে যাবে।

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত