নতুন বছরের আগমন ঘটেছে। সবাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এ বছরকে বরকতময় করেন, সব অবস্থা সংশোধন করেন এবং আয়ু, আমল, রিজিক ও সন্তান-সন্ততিতে বরকত দান করেন।
কোথায় সেই ব্যক্তি, যে সম্পদ জমা করেছিল এবং অন্যদের ওপর অহংকার করেছিল? কবর তাকে নিজের মধ্যে ধারণ করেছে, মাটি তাকে ঢেকে ফেলেছে, পোকামাকড় তার দেহ ক্ষয় করে দিয়েছে। তার সঙ্গে অবশিষ্ট রয়েছে শুধু তার কৃতকর্ম। তখন কী অবস্থা হবে, যখন আল্লাহ সবাইকে কেয়ামতের ময়দানে একত্র করবেন? ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাদের এমন এক দিনে একত্র করব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জিত কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে এবং তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।’ (সুরা আলে ইমরান ২৫)
হে আল্লাহর বান্দারা! সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে তার জীবনকে সৎকর্মের ভাণ্ডারে পরিণত করেছে। আর দুর্ভাগা সেই ব্যক্তি, যার বিরুদ্ধে তার মন্দ কথা ও পদস্খলন সাক্ষ্য দেবে। সুতরাং নিজের জীবনকে মন্দ কাজ থেকে সংরক্ষণ করুন। মহান আল্লাহ পরকালে আপনাকে রক্ষা করবেন। মৃত্যুর পূর্বে জীবনের দিনগুলোকে মূল্যবান করে তুলুন। মৃত্যু মানুষের সব আশা আকাক্সক্ষা কেড়ে নেয়। তখন সঞ্চিত ধন-সম্পদ কোনো উপকারে আসে না। বান্দার সঙ্গে তার আমল ও উপার্জিত কর্ম ছাড়া আর কিছুই যায় না।
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই হৃদয়, যা তার প্রতিপালকের সামনে বিনীত হয়েছে। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখে, রবের সামনে মাথা উঁচু করতে পারে না। তার হৃদয় সদা জাগ্রত, সর্বদা প্রভুর সঙ্গে কথোপকথনে মগ্ন। সে অভাবগ্রস্ত ও অপমানিত ব্যক্তির মতো আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং সাহায্য প্রার্থনা করে।
হে আল্লাহর বান্দারা! বান্দা যখন নিজের দুর্বলতা, দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব, প্রয়োজন, অক্ষমতা ও ত্রুটি নিয়ে চিন্তা করে এবং মহান দানশীল আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে, তখনই প্রকৃত মুখাপেক্ষিতা অর্জিত হয়। বান্দা যত বেশি আল্লাহর মুখাপেক্ষী হবে, তার তত বেশি তৌফিক, রিজিক, সচ্ছলতা ও সুখ লাভ হবে। প্রকৃত মুখাপেক্ষীতা হলো বান্দার এই দৃঢ় বিশ্বাস যে, এক মুহূর্তের জন্যও সে তার রবের মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত নয়। প্রকৃত মুখাপেক্ষিতা হলো, আল্লাহর মাধ্যমে অন্য সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে যাওয়া।
আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষীতা হলো এই দৃঢ় ইমান ও সত্য বিশ্বাস যে, আল্লাহই যথেষ্ট, তিনিই সাহায্যকারী, তিনিই সমর্থনদাতা। বান্দার কোনো কৌশল, শক্তি বা সামর্থ্য নেই আল্লাহর অনুমতি, ইচ্ছা, ক্ষমতা, তৌফিক ও সাহায্য ছাড়া।
প্রকৃত মুখাপেক্ষী ব্যক্তি সে, যে তার দ্বীন ও দুনিয়ার প্রতিটি বিষয়ে নিজের অভাব উপলব্ধি করে এবং সর্বদা তার রবের কাছে প্রার্থনা করে, যেন তিনি তাকে এক পলকের জন্যও নিজের নফসের ওপর সোপর্দ না করেন এবং তার সব কাজে সাহায্য করেন।
হে মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহর কাছে পৌঁছার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ হলো তার প্রতি মুখাপেক্ষীতার দরজা। বান্দা যত বেশি আল্লাহর সামনে বিনীত হবে, তত বেশি তার নিকটবর্তী হবে। আর যত বেশি মানুষের সম্পদের মুখাপেক্ষী হবে, তত বেশি অপমানিত হবে। আল্লাহর কাছে মানুষের সবচেয়ে বেশি মর্যাদা তখনই, যখন সে তার সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী হয়।
বান্দা যত বেশি আল্লাহকে জানবে, তত বেশি তার কাছে নিজেকে মুখাপেক্ষী মনে করবে এবং তত বেশি বিনয়ী হবে। ফুযাইল ইবনে ইয়াদ (রহ.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে সেই ব্যক্তি, যে তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।’ আল্লাহভীতির মতো কোনো কিছু বান্দাকে তার দ্বীনের ব্যাপারে এত বেশি সাহায্য করে না।
মহান আল্লাহ সবাইকে রক্ষা করুন। এই গভীর প্রজ্ঞার দিকে লক্ষ্য করুন। যখন আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা বিশুদ্ধ হয়, তখন এর মাধ্যমে অন্যদের থেকে অমুখাপেক্ষিতা অর্জিত হয়। আর যখন অমুখাপেক্ষিতা অর্জিত হয়, তখনই প্রকৃত মুখাপেক্ষিতা পরিপূর্ণ হয়।
হে মুসলমানরা! দোয়া, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, আত্মসমালোচনা, বিনয়, আগ্রহ, তওবা, ভয়, ভালোবাসা, নিয়মিত জিকির, ইস্তেগফার, প্রকাশ্য ও গোপনে আল্লাহভীতি এবং তার আদেশ পালনের মাধ্যমে বান্দা মুখাপেক্ষিতার মর্যাদা অর্জন করে।
মহান আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতার মাধ্যমে সচ্ছলতা আসে, সাহায্য নেমে আসে এবং রহমত বর্ষিত হয়। যে ব্যক্তি প্রকৃত সচ্ছলতা চায়, সে যেন ধনবান আল্লাহর দরজায় অবিচল থাকে এবং মুখাপেক্ষিতা ও বিনয়ের হাত দিয়ে সে দরজায় কড়া নাড়ে। তাহলে সে মহান দানশীল আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের সুসংবাদ লাভ করবে।
মহান আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতার মাধ্যমে পরিপূর্ণ সুখ ও মহান সফলতা অর্জিত হয়। বান্দা যত বেশি তার রবের কাছে বিনীত ও মুখাপেক্ষী হয়, তত বেশি তার কাছে মর্যাদাবান ও প্রিয় হয়ে ওঠে।
হে আল্লাহর বান্দারা! যখন আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা সঠিক হয়, তখন ইবাদত বিশুদ্ধ হয়ে যায় এবং আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেয়। যার হৃদয় তার রবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়, সে ইবাদতের স্বাদ অনুভব করে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ! তোমরা সবাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহই অভাবমুক্ত, প্রশংসিত। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সরিয়ে দিতে পারেন এবং নতুন সৃষ্টি নিয়ে আসতে পারেন। আর এটা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।’ (সুরা ফাতির ১৫-১৭)
হে মুসলমানরা! হৃদয়ের বন্দিত্ব শরীরের বন্দিত্বের চেয়েও ভয়াবহ। হৃদয়ের দাসত্ব শরীরের দাসত্বের চেয়েও কঠিন। মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পথভ্রষ্ট এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেই ব্যক্তি, যার হৃদয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে পড়েছে।
প্রবৃত্তির অনুসরণও এক ধরনের উপাসনা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছ, যে তার প্রবৃত্তিকেই নিজের উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে?’ (সুরা ফুরকান ৪৩)
যে ব্যক্তি কোনো সৃষ্টির সঙ্গে হৃদয়কে বেঁধে ফেলে, সে তার সামনে নত হয়। তার অন্তরে সেই পরিমাণ দাসত্ব জন্ম নেয়, যতটুকু সে তার কাছে নত হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির একটি হলো হৃদয়ের ক্ষতি, আরেকটি হলো সময়ের ক্ষতি। সময়ের অপচয় হয় আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে। হৃদয়ের অপচয় হয় আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়াকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে। দীর্ঘ আশা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষের জীবনকে নষ্ট করে দেয়। পক্ষান্তরে হেদায়েতের অনুসরণ এবং মহান আল্লাহর সাক্ষাতের প্রস্তুতি মানুষের জীবনকে সংশোধন করে।
মহান আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা না থাকা মানুষকে অহংকারের দিকে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার ইবাদত থেকে অহংকারবশত বিরত থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা গাফির ৬০)
জেনে রাখুন, মানুষের সামনে তিনটি বড় বাধা রয়েছে। এক. শিরক। দুই. বেদয়াত। তিন. গুনাহ। শিরক দূর হয় তৌহিদের মাধ্যমে। বেদয়াত দূর হয় সুন্নাহর মাধ্যমে। আর গুনাহ দূর হয় খাঁটি তওবার মাধ্যমে।
অতএব, আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি দয়া করবেন। আপনারা নতুন বছরকে তওবা ও সৎকর্মের মাধ্যমে শুরু করুন। কারণ দিনগুলোই মানুষের আয়ুর পরিমাপক এবং আমলের নির্ধারিত সময়। জীবন খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়, দিনগুলো দ্রুত অতিক্রম করে চলে যায়।
মুমিনের আমল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শেষ হয় না। আল্লাহ মুমিনের আমলের জন্য মৃত্যু ছাড়া আর কোনো সমাপ্তি নির্ধারণ করেননি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাক, যতক্ষণ না তোমার কাছে নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) এসে যায়।’ (সুরা হিজর ৯৯)
এ সময়ে আপনারা যেসব উত্তম আমলের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারেন, তার অন্যতম হলো আশুরার রোজা। নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। সুতরাং আপনারা আশুরার রোজা পালনে সচেষ্ট হন।
হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি মহান আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী ১ বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ (সহিহ মুসলিম)
ইহুদিরাও আশুরার দিন রোজা রাখত। তাই নবীজি (সা.) আশুরার আগে এক দিন অথবা পরে এক দিন মিলিয়ে মোট দুটি রোজা রাখতে বলেছেন। (মুসনাদে আহমাদ) আরেক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি আগামী বছর পর্যন্ত জীবিত থাকি, তাহলে নবম ও দশম তারিখ রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম)
মহান আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের আমল কবুল করুন। তিনি যেন আমাদের বর্তমানকে অতীতের চেয়ে উত্তম করেন এবং ভবিষ্যৎকে বর্তমানের চেয়ে উত্তম করেন।
হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মানিত করুন। শিরক ও মুশরিকদের অপদস্থ করুন। দ্বীনের সীমানা রক্ষা করুন। মুমিন বান্দাদের সাহায্য করুন। জালেম এবং দ্বীনের সব শত্রুকে পরাভূত করুন।
হে আল্লাহ! মুসলিম শাসকদের আপনার কিতাব ও আপনার নবীর সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার তৌফিক দিন। তাদের মুমিনদের জন্য রহমতস্বরূপ বানান। তাদের সবাইকে সত্য ও হেদায়েতের ওপর একত্রিত করুন।
১৯ জুন শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান