আর হলো না দেখা
সময়টা ২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল। লন্ডনের বিখ্যাত কনসার্ট হল ওটু এরেনায় শোরগোল সহস্র অপেক্ষমাণ ভক্তের কলকাকলিতে। অপেক্ষা ‘কিং অব পপ’কে এক নজর দেখার জন্য, ঘণ্টাখানেক হলো দাঁড়িয়ে আছেন সবাই। অবশেষে দেখা মিলল সেই মহাতারকার। কালো লিমুজিন গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী মিলিটারি স্টাইলের এমব্রয়ডারি করা জ্যাকেট, কালো প্যান্ট আর সানগ্লাস, সঙ্গে চিরচেনা আন্তরিক হাসির অভিব্যক্তি। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ল ভক্তরা। গোটা ওটু এরেনা ‘মাইকেল, মাইকেল’ ধ্বনিতে মুহুর্মুহু কেঁপে উঠছে। মঞ্চে আবিষ্ট হলেন মাইকেল। মাইক্রোফোনের সামনে কিছুক্ষণ চুপ করে চারপাশের আবহটা উপভোগ করলেন তিনি। তারপর লাজুক কণ্ঠে ভক্তদের উদ্দেশে বললেন, ‘আই লাভ ইউ!’ আবারও প্রকম্পিত হলো ভেন্যুর অন্দরমহল। কারণ দীর্ঘ ৮ বছরের নিঃসঙ্গ-নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে আবারও মঞ্চে পারফর্ম করতে চলেছেন মাইকেল! আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সব বয়সের দর্শকের সরব উপস্থিতি তার তারকাখ্যাতিকে কষ্টিপাথরে ঘষে প্রমাণ করল আরেকবার। আর সেটাই ছিল যুক্তরাজ্যের মাটিতে মাইকেলের শেষ কনসার্ট। বিদায় নেওয়ার সময় প্রিয় ভক্তদের বলে গেলেন মাইকেল, আবার দেখা হবে! সেদিন কেউ হয়তো ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি, মাইকেল আর কখনো ফিরবেন না তার ভক্তদের মাঝে।
আলোড়িত প্রস্থান
২০০৯ সালের আজকের দিনে (২৫ জুন) বিশ^কে স্তব্ধ করে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান পপ জগতের অবিসংবাদিত সম্রাট। যে মানুষটি দেড়শ বছর বেঁচে থাকার জন্য নানান কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তিনিই কিনা মাত্র পঞ্চাশেই নিজেকে শেষ করে দেন মাত্রাতিরিক্ত প্রপোফল সেবনে। তার মৃত্যুতে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন পড়ে যায়। ভেঙে পড়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থা। মাইকেল জ্যাকসন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকে তার ভক্ত ও সাধারণ মানুষ গুগলে সার্চ শুরু করে। মাইকেল জ্যাকসন শব্দটি মিলিয়ন মিলিয়ন বার ইনপুট হওয়ার কারণে গুগল কর্র্তৃপক্ষ ভাবে, তাদের সার্চ ইঞ্জিন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। যার কারণে তার মৃত্যুর দিনে আধা ঘণ্টা বন্ধ থাকে গুগল। কর্র্তৃপক্ষ জানায়, তাদের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম। মাইকেলের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা বিশ্বে। তার প্রিয় সহকর্মী আর বন্ধুরা ব্যথিত হৃদয়ে বিদায় জানান তাকে। চিত্রপরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গম পপ কুইন ম্যাডোনাসহ অনেক কাছের মানুষরাও কান্না থামিয়ে রাখতে পারেননি।
বিরল ইতিহাস
মৃত্যুর প্রায় ১৭ বছর পরও মাইকেল জ্যাকসন গ্লোবাল ডিজিটাল আর্টিস্ট র্যাংকিংয়ে এক নম্বর শিল্পীর জায়গা দখল করেছেন। তার কালজয়ী গানগুলো বিভিন্ন স্ট্রিমিং ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মৃত্যুর পর ফোর্বস-এর তালিকায় বারবার সর্বোচ্চ আয় করা মৃত তারকা হিসেবে শীর্ষস্থান অর্জন করেছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা নতুন করে চিনতে শুরু করে মাইকেল জ্যাকসনকে। সংগীত, নৃত্য এবং ফ্যাশনে তার চার দশকেরও বেশি সময়ের অবদান তাকে পপসংগীতের বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত করেছে।
উত্থান, স্বীকৃতি ও অর্জন
১৯৮২ সালে মাইকেল ফিরে থ্রিলার নামক বিশেষ এক চমক নিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রীত অ্যালবামের তালিকার শীর্ষস্থানটি আজও থ্রিলারের দখলে। মোট ১২টি গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়ে ৮টিই জিতে নেয় এই মাস্টারপিস। থ্রিলারের সব গানই জনপ্রিয় হয়েছিল, কিন্তু আলাদা করে টাইটেল ট্র্যাক ‘থ্রিলার’-এর কথা বলতেই হবে। জন ল্যান্ডিসের পরিচালনায় নির্মিত থ্রিলারের ১৪ মিনিটের হরর মিউজিক ভিডিও জম্বির সাজে হাজির হন খোদ মাইকেল, তার মোহনীয় নাচের ভঙ্গি আর কণ্ঠের জাদুতে থ্রিলার আমেরিকায় তোলপাড় ফেলে দেয়। এরপর সংগীতের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে আটটি গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করে রেকর্ড গড়েছিলেন ‘পপ কিং’। এক আসরে এতগুলো গ্র্যামি পুরস্কার ঝুলিতে ভরার রেকর্ড এত বছরেও ভাঙতে পারেননি আর কোনো সংগীতশিল্পী। জীবদ্দশায় মোট ১৩টি গ্র্যামি পুরস্কার পেয়েছিলেন মাইকেল। তিনিই সবচেয়ে বেশি অ্যাওয়ার্ড ও নমিনেশন পাওয়া তারকা। এ জন্য হলিউড ওয়াক অব ফেমে ঠাঁই পেয়েছে তার নামে দুটি তারা। একটি তার নিজের জন্য। আরেকটি জ্যাকসন ফাইভ ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে।
বক্স অফিসও জ্যাকসনের দখলে
মৃত্যুর বক্স অফিসের সিংহাসনও এখন পপসম্রাটের দখলে। সব রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিয়ে হলিউডের ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে সফল মিউজিক্যাল বায়োপিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘মাইকেল’। হলিউডের বক্স অফিস ট্র্যাকিং রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী আয়ের দিক থেকে মাইকেল সিনেমাটি ইতিমধ্যে বিলিয়ন ডলার ক্লাব অতিক্রম করেছে। মাইকেলের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে যার নাম সবার আগে আসছে, তিনি পপসম্রাটের আপন ভাতিজা জাফর জ্যাকসন। পর্দায় জাফর যেভাবে জাদুকরি মুনওয়াক, নিখুঁত কণ্ঠস্বর আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে জ্যাকসনকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন, তা দেখে দর্শক ও সমালোচকরা মুগ্ধ হয়ে গেছেন। মাইকেলের এই অভাবনীয় সাফল্যের পর এরই মধ্যে সিকুয়েলের ঘোষণা দিয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান লায়ন্সগেট।
ব্যক্তিজীবনে
ব্যক্তিজীবনে মাইকেল ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও প্রচারবিমুখ, খুব প্রয়োজন না হলে তিনি ক্যামেরার সামনে সাক্ষাৎকার দিতেন না। ভালোবাসতেন মেক্সিকান খাবার, সময় পেলেই বই পড়তেন। পোষা প্রাণীর বাতিক ছিল মাইকেলের। শিম্পাঞ্জী বা অজগর সবই ছিল তার পোষ্য। সবসময় চাইতেন নিজের সেরাটা দিতে। তার বোন জ্যানেট জ্যাকসনকে নিয়ে বানিয়েছিলেন সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিও ‘স্ক্রিম’ ৭ মিলিয়ন ডলার বাজেটের ভিডিওটি সম্পূর্ণ সাদাকালো। নৃত্যশিল্পী হিসেবে জ্যাকসন ছিলেন এক অতুলনীয় প্রতিভা। ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্রিট ডান্সারদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ‘রোবট’ এবং ‘মুনওয়াক’-এর মতো জটিল নাচের মুদ্রাগুলোকে বিশ্বমঞ্চে নিখুঁতভাবে পপ সংস্কৃতির অংশ করে তোলেন। যে মাইকেলকে এক নজর দেখার জন্য লাখ লাখ মানুষ চাতকের মতো অপেক্ষা করতেন, যার গানে ভক্তরা ছিলেন মাতোয়ারা. সেই চেহারাকেই ঘৃণা করতেন মাইকেল। মূলত বাবার প্রতি ক্রোধের কারণেই বারবার নিজের চেহারাকে বারবার কাটাছেঁড়া করতেন এই নক্ষত্র।