‘প্রভাব’ ঠেকাতে পুলিশে শুদ্ধি অভিযান

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০২:৫৫ এএম

আলোচিত সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ও ডিবি হারুনের মতো কতিপয় কর্মকর্তার কারণে বিগত সময়ে ভাবমূর্তি তলানিতে গিয়ে ঠেকে বাংলাদেশ পুলিশের। তাদের তান্ডবে তটস্থ ছিল পুরো বাহিনীও। দুর্নীতি থেকে শুরু করে গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর সব অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এদের প্রায় সবাই চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, অনেকে গ্রেপ্তার হন এবং অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। বর্তমানে কেউ যেন বেনজীর বা হারুন হয়ে উঠতে না পারে এবং কোনো কর্মকর্তা দল কিংবা আত্মীয়তার নাম ভাঙিয়ে আগের মতো একক ‘প্রভাব’ বিস্তার করতে না পারে, সেজন্য পুলিশে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে বিএনপি সরকার। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে এই অভিযান।

এরই মধ্যে পুলিশের সার্বিক বিষয় নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহলে বিশদ আলোচনা হয়েছে। অতি উৎসাহী দলবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তালিকা করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি যারা সরকার ও পুলিশের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করছে, তাদের নিয়েও তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তাছাড়া লোভনীয় পদে যেসব পুলিশ সদস্য তদবির করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে ’খারাপ স্থানে বদলি’ করতে বলা হয়েছে বলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন এই প্রতিবেদককে। এদিকে গত রবিবার পুলিশের পাঁচ কর্মকর্তাকে ওএসডি এবং ১৬ কর্মকর্তাকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পুলিশ বাহিনী থেকে দলবাজি, তোষামোদি এবং চাঁদাবাজির সংস্কৃতি চিরতরে নির্বাসিত করতে হবে। সৎ, যোগ্য এবং পেশাদার কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পুলিশ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ও জনগণের বন্ধু হিসেবে নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ফিরে পাবে। আতঙ্ক কাটিয়ে পুলিশ আবার সাহসের সঙ্গে মাঠে নামুক এটাই হোক শুদ্ধি অভিযানের মূল লক্ষ্য।

পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশকে জনবান্ধব বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। পুলিশের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান জোরাল হচ্ছে। পুলিশে থেকে কোনো ধরনের অপরাধ করতে পারবে না। যারা এসব করবে, তাদের ’কঠিন শাস্তি’ পেতেই হবে। পুলিশ রাজনীতির বাহিরে থেকেই দায়িত্ব পালন করছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের অভ্যন্তরে একটি ব্যাপক ‘শুদ্ধি ও সংস্কার’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সাধারণ ও পেশাদার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সুবিধাভোগী চক্রের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর, সাময়িক বরখাস্ত এবং ফৌজদারি মামলার ভয়ে তটস্থ অনেকেই এখন রীতিমতো আত্মগোপনে বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এ ছাড়া আসামি ধরা বা তদন্তের অর্থ কামাচ্ছেন অসাধু পুলিশ সদস্যরা। বিষয়টি সরকারের উচ্চমহলেরও নজরে এসেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান পুলিশ লীগের ক্যাডাররা। বিএনপি সরকার পুলিশের ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টা করছে এবং পুলিশে নতুন করে কোনো একক ব্যক্তির প্রভাব-বলয় যেন তৈরি হতে না পারে, সেজন্য এই শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশের সবগুলো ইউনিটের শীর্ষ পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তারাও যেন বেপরোয়া না হতে পারেন, কিংবা ‘পুলিশ দল’ গড়তে না পারেন এসব বিবেচনায় নিয়ে এই শুদ্ধি অভিযান হচ্ছে।

মিথ্যা মামলার তদন্ত হচ্ছে : ২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনের সময় দুই শতাধিক মামলা হয়েছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। আর আসামি করা হয়েছিল এক লাখের বেশি। এই নিয়ে অনেক সমালোচনাও আছে। ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার নিয়ে সহিংসতায় ৮শ’র মতো মানুষ মারা গেছে। এ সময় আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মীও মারা যান। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের স্বজনসহ বাইরের লোকজন মামলা করেছেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ নেতা থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়। আবার এসব মামলায় ব্যবসায়ী ও নিরীহ লোকজনকে আসামি করা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার। বিষয়টি নিয়ে এখনো সমালোচনা হচ্ছে। এসব মামলার পেছনে একশ্রেণির প্রতারকচক্র সক্রিয় আছে। তাদের নিয়ে কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্য আসামি ধরা ও মামলা-বাণিজ্য করেছেন দেদারসে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর বিশেষ নির্দেশনাও দিয়েছে। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারাও নড়েচড়ে বসেছেন। মিথ্যা মামলাগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে শ’খানেক মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বলয় থেকে বের করতে হবে : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশকে আগে রাজনৈতিক বলয় থেকে বের করতে হবে। আমি চেষ্টা করেও পারিনি। পুলিশ সংস্কারের সুপারিশগুলো আমলে নিলে বাহিনীর জন্যই ভালো হতো। পুলিশে নিয়মিত শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। তদবিরের কালচার চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পুলিশের প্রতিটি কাজে জবাবদিহি আনতে হবে। রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার না হলে জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে উঠবে দ্রুত সময়ের মধ্যেই।

অভিযুক্তদের মধ্যে দুশ্চিন্তা : পুলিশ সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দপ্তর এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের গ্রিন সিগন্যালের আসায় ‘শুদ্ধি অভিযান’ মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল থেকে শুরু করে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বিগত বছরগুলোয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ‘দলবাজি’, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ‘চাঁদাবাজির’ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তারা আছেন বেশি দুশ্চিন্তায়। নতুন সরকার আসার পরও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বেশির ভাগ কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি ও ভালো পদে চলে যাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, কেউ কেউ মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে পদোন্নতির পাশাপাশি পছন্দের স্থানে বদলি হচ্ছেন। এই নিয়ে অনেকেই ক্ষুব্ধ।

নিরপেক্ষতার আড়ালে নির্যাতনের অভিযোগ : পুলিশ নিরপেক্ষ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে নেই। দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগ থেমে নেই। গত নভেম্বরে নেত্রকোনা সদর থানায় রিমান্ডে থাকা এক আসামিকে হাত-পা-চোখ বেঁধে থানার কোয়ার্টারে ঝুলিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় মানবাধিবার সংগঠন আসক জানিয়েছে, এটা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) আইনের লঙ্ঘন। গেল ডিসেম্বরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানাতেও পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, নির্যাতন, আটক করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অভিযোগের মাত্রা বেড়েই চলেছে। ঘটনার প্রমাণ মিললে প্রত্যাহার, সাময়িক বরখাস্ত বা বদলিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

গত ২৪ জুন চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘অসুস্থ হয়ে’ এক যুবলীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। তাকে আগের দিন সাতকানিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। নির্যাতন করে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, গ্রেপ্তারের পরের দিন গত বুধবার সকালে তার শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং তিনি বুকে ব্যথা অনুভবের কথা বলেন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তবে নিহতের বড় বড় ভাই নূর মোহাম্মদের অভিযোগ, জায়গা-জমি নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধের জেরে ‘যুবলীগ ট্যাগ’ দিয়ে নুরুল আলমকে গ্রেপ্তার করানো হয়। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করত, নিয়মিত রেয়াজউদ্দিন বাজারের দোকানে বসত। পুলিশ তাকে নির্যাতন করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে রহস্য উদঘাটন করার দাবি জানান তিনি।

লাগাম টানার চেষ্টা কর্তৃপক্ষের : পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে মামলা নিয়ে প্রতারক চক্র সক্রিয় হওয়ার গুরুতর অভিযোগ এসেছে। আইনজীবী পরিচয় দিয়ে কেউ কেউ প্রতারক চক্রদের সহযোগিতা করছেন। আবার প্রতারকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও সম্পর্ক আছে। সুযোগ পেয়ে তারা মিলেমিশে অপকর্ম করছেন। দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যও এসব অপকর্মে জড়িত। পুলিশে এক কর্মকর্তার প্রভার দূর করতে এবং বিভিন্ন অনিয়ম ঠেকাতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান আসছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি ঠেকাতে জিরো টলারেন্স নীতিতে যাওয়া হচ্ছে। আইজিপি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে কয়েক দফা বিশেষ বৈঠক করেছেন এই নিয়ে। যারা দলবাজ, অনিয়ম ও দুর্নীতিবাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে ডিআইজি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও পুলিশে তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। তারপরও বর্তমান সরকার পুলিশের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড লাগাম টানার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা ঘাপটি মেরে আছেন। নানা রকম অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। পেশাদার অপরাধীর মতোই মাদক কারবার, চাঁদাবাজি করছেন। যানবাহন থামিয়ে ‘উপরি’ ওঠাচ্ছেন। সম্প্রতি চট্রগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে নির্যাতন করায় দেশ-বিদেশে তোলপাড় চলছে। এই ঘটনার পরই পুলিশের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর বিষয়ে আরও জোরাল হয়। সেই আলোকে চট্টগ্রামে অভিযানের অংশ হিসেবে গণবদলি করা হয় গত কয়েক দিনে। এর মধ্যে দুইজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তিনজন উপ-পুলিশ কমিশনার, আটজন ওসি ও আটজন ইন্সপেক্টর রয়েছেন।

আমলে আসছে না সুপারিশ : অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশ সংস্কার নিয়ে দেওয়া প্রতিবেদনের কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রতিবেদনে বাহিনীর মধ্যে নিয়োগ ও বদলি-বাণিজ্যকে দুর্নীতির প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পুলিশের একাংশ অপরাধীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে এবং বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া, মাদক, মানবপাচার ও অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও যোগসাজোশের অভিযোগ রয়েছে। জনমত জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু কমিশরের সুপারিশ আমলেই নেওয়া হচ্ছে না।

কঠোর বার্তার পরও রাজনৈতিক নিয়োগ : সরকার গঠনের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয় পুলিশের কোনো পদে তদবির করা হলে তা বাতিল করা হবে। এই বার্তার মধ্যেই আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালকসহ শীর্ষ মহলে ‘রাজনৈতিক’ তদবিরে নিয়োগ হয়েছে। এ ছাড়া অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে তদবির চালিয়ে আসছেন কেউ কেউ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত