ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট

গবেষণায় মনোযোগ বাড়াতেই হবে

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০১ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হলো উচ্চশিক্ষাঙ্গনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং তা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরিসরে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গবেষণা মৌলিক বা প্রায়োগিক হতে পারে। ৩০ জুন ‘ঢাবিতে ১০৩৩ কোটি টাকার বাজেট, গবেষণায় বরাদ্দ নেই’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির গর্ভে যে তথ্য রয়েছে তাতে সংগতই সংশ্লিষ্ট মহলের জ্ঞাত-অজ্ঞাতের বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এক্ষেত্রে কতটা বাস্তবসম্মত ভূমিকা রেখেছে প্রশ্ন আছে তা নিয়ে ও। দেশের শীর্ষ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৩৩ কোটি ২১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের অন্যতম মূল অনুষঙ্গ গবেষণার বিষয়টি আমলেই নেওয়া হলো না! এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ইউজিসির মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও প্রতীয়মান হয়। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার মোট চাহিদার তুলনায় অর্থের সংস্থান হয়েছে ৬৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকার আর্থিক ঘাটতি থাকছে। আর্থিক ঘাটতি থাকলেও অন্য খাত থেকে বরাদ্দ ছেঁটে কিংবা ভিন্ন কোনো উপায়ে হলেও গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়নি কেন? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা গুরুত্ব পাবে এবং এর পথ হবে সুচারু, এটিই স্বাভাবিক। বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি আমরা জ্ঞান সৃষ্টির আধার হিসেবে গণ্য করি, সেখানে উপযুক্ত গবেষণা

থাকতেই হবে। শুনতে অপ্রীতিকর হলেও অসত্য নয় যে, আমাদের শিক্ষার নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তারা একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যতটা আগ্রহী, গবেষণার বিষয়ে তারা ততটাই অনাগ্রহী। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় উভয় ক্ষেত্রেই গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শিক্ষাবিদদের বারবার তাগিদ সত্ত্বেও থেকে যাচ্ছে উপেক্ষিত, যা মোটেও কোনো শুভ লক্ষণ নয়। বিশে^র মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানক্রমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে, এর অন্যতম কারণ গবেষণায় দুর্বলতা ও অপ্রতুলতা তা তর্কাতীত। পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন গবেষণা না হওয়া নিয়ে এ পর্যন্ত কথা কম হয়নি। কিন্তু এ যেন ‘অরণ্যে রোদন’! নোবেলজয়ী হাঙ্গেরিয়ান-আমেরিকান প্রাণরসায়নবিদ অ্যালবার্ট সেন্ট জর্জি বলেছেন, ‘গবেষণা মানে হলো, সবাই যা দেখছে তা-ই দেখা, কিন্তু এমনভাবে ভাবা যা আগে কেউ কখনো ভাবেনি।’ আর বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত জার্মান-সুইস মনোবিজ্ঞানী এবং আধুনিক অস্তিত্ববাদী দর্শনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কার্ল জ্যাসপার্স বলেছেন, ‘শিক্ষাদান এবং গবেষণার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে না।’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ গভীর করতেই হবে। গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে র‌্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি তা স্বস্তির বিষয় নয়। মনে রাখা দরকার, র‌্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত গবেষণা, প্রকাশনা, সাইটেশন এবং উদ্ভাবন এই বিষয়গুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কাজেই তা উপেক্ষার নয়, বরং অধিক গুরুত্বের ব্যাপার। ইতিপূর্বে দেশ রূপান্তরের ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গবেষণায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই কিছু টাকা খরচ দেখায় এবং অভিযোগ আছে, তারা লোক দেখানোর জন্য এটা করে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই

প্রকৃতপক্ষে তেমন কোনো গবেষণা হয় না। গবেষণায় বরাদ্দ না থাকলে ইউজিসির চাপ থাকে, সেজন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কিছু টাকা এ খাতে রেখে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। এমনটি আত্মঘাতীর শামিল বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করি, ঢাবি কর্র্তৃপক্ষ তো বটেই, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে মনোযোগী হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকেও এ ব্যাপারে অধিকতর তৎপর হতে হবে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মুক্তচিন্তা এর মূল ভিত্তি। গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পান বিধায়ই উন্নত দেশে তো বটেই, অনেক উন্নয়নশীল দেশও এদিকে ক্রমেই দৃষ্টি গভীর করছে। আমরা মনে করি, গবেষণা ও প্রকাশনা শুধু একাডেমিক অর্জন নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, দক্ষতা এবং ক্যারিয়ার গঠনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। শিক্ষার ভিত্তি যদি দুর্বল থাকে জাতি সবল হবে কীভাবে? গবেষণা খাতে বরাদ্দের অপ্রতুলতার ছায়া সরাতেই হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত