আলিফা চীনের জন্মের গল্পে দুই দেশের বন্ধুত্ব

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৮ এএম

গল্পটা চট্টগ্রামের ‘লিটল চায়না’ খ্যাত ‘আলিফা চীন’-এর। ব্যতিক্রমী নামের এই মেয়েটির জন্মের ঘটনা দুই দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। বন্ধুত্বের বন্ধন মেয়েটির বয়সের সমান্তরালে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

আলিফার জন্মটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে প্রসবজনিত জটিলতা নিয়ে আলিফার মা জান্নাতুল ফেরদৌস চট্টগ্রামের পতেঙ্গার নৌবাহিনী হাসপাতালে ভর্তি হন। জান্নাতুল ফেরদৌস ছিলেন এই হাসপাতালেরই অফিস সহায়ক। আর বাবা আনোয়ার হোসেন মেরিন ফিশারিজ একাডেমির পাচক। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, হার্টের মারাত্মক অসুস্থতার কারণে মায়ের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। মা ও সন্তানের মৃত্যুঝুঁকি প্রবল। ঠিক ওই সময় চট্টগ্রাম উপকূলে শুভেচ্ছা সফরে আসে চীনের নৌবাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সমুদ্রগামী হাসপাতাল জাহাজ ‘পিস আর্ক’। জাহাজটি ‘মিশন হারমনি’ নামের বিভিন্ন মেডিকেল ও মানবিক মিশনের অধীনে বিশ্বজুড়ে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে থাকে।

জান্নাতুল ও তার সন্তানের জীবন বাঁচাতে নৌবাহিনী হাসপাতালের চিকিৎসকরা চীনের ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চীনের চিকিৎসকরা নৌবাহিনী হাসপাতালে এসে অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব নেন। অস্ত্রোপচার সফল, জন্ম হয় আলিফার।

চীনা চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মা-বাবা আরিফার সঙ্গে ‘চীন’ যুক্ত করে মেয়ের নাম রাখেন আলিফা চীন। মেয়েটি এখন চীন-বাংলাদেশের মৈত্রীর প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। অনেকেই তাকে ‘লিটল চায়না’ নামেও ডাকেন।

বাংলাদেশ সফরে আসা চীনা নৌবাহিনীর ডাক্তারদের জন্য জান্নাতুল ও তার সন্তানের জীবন বাঁচানোর অস্ত্রোপচার ছিল একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে তারা জয়ী হন। তাই এখনো চীনের নৌবাহিনী আলিফার পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে। মেয়েটির লেখাপড়ারও দায়িত্ব নিয়েছে তারা। আলিফা চীন এখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী পরিচালিত চট্টগ্রাম বিএএফ শাহীন কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল জাহাজ পিস আর্ক ২০১৩ সালে পুনরায় বাংলাদেশ সফরে আসে। আলিফা ও তার মাকে ডেকে নিয়ে ওই হাসপাতালে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায় দুজনেই সুস্থ আছেন। পিস আর্ক জাহাজের ডা. শেং রুইফাং আলিফার জন্মের অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে এখন আলিফার সম্পর্ক মা-মেয়ের মতো। এ সম্পর্কও এখনো অটুট আছে।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এলে আলিফাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চীনের দূতাবাসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরের বছর চীনের দূতাবাসের পক্ষ থেকে আলিফাকে উপহার হিসেবে রঙিন টিভি ও শিক্ষাসামগ্রী পাঠানো হয়। ২০১৮ সালে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এয়ারকুলারসহ নানা উপহার সামগ্রী দেওয়া হয়।

হাসপাতাল জাহাজ পিস আর্কের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১৯ সালে আলিফার পরিবারকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এরপর থেকে আলিফার লেখাপড়ার সব খরচ চীন থেকে প্রদান করা হচ্ছে। আলিফা ২০২৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে একটি চিঠি পাঠায়। বাংলায় লেখা সে চিঠিতে সে তার জন্মের বৃত্তান্ত তুলে ধরে চীন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। ভবিষ্যতে চীনে গিয়ে চিকিৎসা বিদ্যায় পড়ে মানবসেবার আগ্রহের কথা জানায়। আলিফার সে চিঠির জবাব দেন চীনের প্রেসিডেন্ট, যা চীনের বাংলাদেশ দূতাবাস আলিফার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে আলিফার পরিবার পুনরায় চীন সফর করে। তখন আলিফাকে সিল্ক রোড অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। আলিফার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার সুবাদে  চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আলিফার স্কুল বিএএফ শাহীন কলেজ পরিদর্শন করেন। তার আমন্ত্রণে ২০২৫ সালে আলিফার শিক্ষক, সহপাঠীসহ ১৭ জনের একটি দল সাত দিনের চীন সফরে যায়।

সম্প্রতি আলিফা চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে শুরুতেই তিনি চীন সরকার, পিস আর্কের চিকিৎসকসহ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার নামটি চীন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটা তার খুব ভালো লাগে। তিনি চীনে গিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়ালেখা করার এবং সে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার স্বপ্নের কথা জানান।

চট্টগ্রাম বিএএফ শাহীন কলেজের উপাধ্যক্ষ তসলিমা বেগম বলেন, আমাদের ছাত্রী আলিফা চীনের জন্মের মধ্য দিয়ে ওই দেশের সঙ্গে একটি উষ্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা চীন সফর করেছে। এটা আমাদের জন্য গৌরবের। এ সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাচ্ছে। চীন সরকারের পক্ষ থেকে শাহীন কলেজের শিক্ষার্থীদের চায়না ভাষা শেখানোর একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও আমরা জেনেছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত