শেষ বাঁশিতে শেষ বাজি

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

কোলাহলের রাজা

৪১ বছর বয়সে এসেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নামের পাশে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ‘কোলাহল’। মাঠে নামার আগে বা পরে, তাকে নিয়ে মাতামাতি থামে না কখনোই। কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ ড্রর পর যখন সাবওয়ের আড্ডা কিংবা পার্কের মানুষের মুখেও তাকে একাদশে রাখা নিয়ে তীব্র সমালোচনা বাড়ছিল, তখনই স্বরূপে ফেরেন সিআর সেভেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ছয় বিশ্বকাপে গোল করার অবিনশ্বর নজির গড়েন তিনি। গোলখরা কাটিয়ে ‘সিউউউ’ উদযাপনের আগে ডাগআউটে ছুটে গিয়ে কোচকে জড়িয়ে ধরে সমালোচনার জবাব দেন এবং নুনো মেন্দেসকে ফ্রি-কিক নিতে দিয়ে দলের প্রতি নিজের নিবেদন প্রমাণ করেন।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ফ্লোরিডার ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের তীব্র গরমে কলম্বিয়ার বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট খেলে রোনালদোকে এক ক্লান্ত ম্যারাথন রানার মনে হয়েছিল। মাঠে তার ‘এক্সপেক্টেড গোলস’ ছিল মাত্র ০.১৭। গঞ্জালো রামোসের মতো তরুণ তুর্কি বেঞ্চে থাকলেও কোচ মার্তিনেজ তাকে মাঠ থেকে তোলার সাহস দেখাননি, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান তো লিখেছে রোনালদো জোর করে নিজের লেগ্যাসি নষ্ট করছেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররাও বলছেন, ‘তিনি আর আগের মতো নেই।’ **এমনকি সমালোচকরা মনে করেন, তার এই অতি-উপস্থিতি পর্তুগালের সোনালি প্রজন্মের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে যেন তার বিশাল ব্যক্তিত্বই এখন দলের ওপর বেশি ছায়া ফেলছে।**

তবু কোচের কাছে তিনি ‘আনটাচেবল’। ক্যারিয়ারের ২৩তম বছরে দাঁড়িয়ে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে রেকর্ড ২৩১ ম্যাচে ১৪৫ গোলের এই মালিকের জন্য এটাই শেষ বিশ্বকাপ। সামনে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বাঁচা-মরার মহাকাব্যিক লড়াই। সব সমালোচনা ছাড়িয়ে নিজের শেষ বিশ্বমঞ্চের অধ্যায়টি জাদুকরী কোনো ট্রফি দিয়ে রাঙাতে চান এ চিরসবুজ গোলমেশিন।

চিরন্তন ঐতিহ্যের রূপকার

৪০ ছুঁইছুঁই লুকা মদ্রিচের শান্ত চোখের দূরদর্শিতা আজও ক্রোয়েশিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি। রিয়াল মাদ্রিদের বর্ণিল অধ্যায় চুকিয়ে এসি মিলানে যোগ দেওয়া এই মিডফিল্ড জেনারেলের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ সুর। কাতার বিশ্বকাপে দলকে সেমিফাইনালে তোলার পর, এবার টানা তৃতীয়বারের মতো ক্রোয়েশিয়াকে নকআউট পর্বে নিয়ে এসেছেন তিনি। টরোন্টোর মাঠে শুক্রবার যখন এই দুই প্রাক্তন রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ মুখোমুখি হবেন, তখন একজনের স্বপ্ন টিকে থাকবে, আর অন্যজনের হয়তো চিরতরে অবসান ঘটবে বিশ্বমঞ্চের মহাকাব্যিক যাত্রার। গ্রুপ পর্বের শুরুটা ইংল্যান্ডের কাছে হেরে খারাপ হলেও, পানামাকে ১-০ এবং ঘানাকে ২-১ গোলে হারিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ক্রোয়াটরা। ঘানার বিপক্ষে ম্যাচের ৮৩ মিনিটে জয়সূচক গোলের অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ট অ্যাসিস্টদাতার রেকর্ড গড়েন মদ্রিচ। শুধু তাই নয়, অন্তিম মুহূর্তে নিজের পেনাল্টি বক্সে এসে প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোল আটকে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, বয়স তার কাছে কেবলই একটা সংখ্যা। পানামার বিপক্ষে ম্যাচেই তিনি ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ পুরুষ ফুটবলার হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ২০০তম ম্যাচের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন। যেখানে সতীর্থরা তাকে ‘ইনফিনিট লেগ্যাসি’ (চিরন্তন ঐতিহ্য) লেখা কালো টি-শার্ট উপহার দেন। কোচ জ্লাতকো দালিচের ভাষায়, ‘লুকা ছিল দুর্দান্ত। ও গোল বানিয়েছে, গোল আটকেছে। ও দমে যেতে জানে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত