ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পরও প্রকৃত মৃতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। বুধবার দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২ হাজার ২৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে চিকিৎসক, বিরোধী রাজনীতিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লা গুয়াইরা শহরের এক ফরেনসিক চিকিৎসক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, সরকারি মৃত্যুর সংখ্যা বাস্তবের এক-তৃতীয়াংশও নয়। তার কর্মস্থলের অস্থায়ী মর্গে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মরদেহ আসছে। অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত বা পচে গেছে যে সেগুলো শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। হিমায়িত ট্রাকে জায়গা না থাকায় অনেক মরদেহ রোদে রাখতে হচ্ছে, ফলে দ্রুত পচন ধরছে।
তিনি বলেন, উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো পর্যাপ্ত সক্ষম না হওয়ায় অনেক পরিবার নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ থেকে স্বজনের মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে নিয়ে আসছে। তার ভাষায়, নিম্ন আয়ের মানুষই এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো অভিযোগ করেছেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করছে। মানবাধিকার সংগঠন প্রোভেয়াও সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছে, জাতীয় এই বিপর্যয়ে তথ্য গোপনের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তবে ভেনেজুয়েলা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড স্মাইলডের মতে, আরও গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত ছাড়া সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তার মতে, বেশি ক্ষয়ক্ষতির তথ্য আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারের জন্য সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানী রাফায়েল উজকাতেগুই মনে করেন, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরকার সঠিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সরকারি তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক ভেনেজুয়েলাবাসী নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বেসরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করছেন। 'ভেনেজুয়েলা রিপোর্টা' নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী ডাটাবেজে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য জমা হয়েছে। যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে ভূমিকম্পের সময় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষ উদ্ধার হয়েছেন বা নিরাপদে সরে যেতে পেরেছেন। বাকিদের ভাগ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফরেনসিক চিকিৎসক জানান, ডিএনএ পরীক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশ মরদেহ ট্যাটু, দাঁতের গঠন কিংবা পোশাক দেখে শনাক্ত করা হচ্ছে। অনেক শিশুর মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে স্বজনদের পক্ষেও তাদের চিনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে স্বজন হারানোর শোক আরও ভারী হয়ে উঠেছে অনেক পরিবারের জন্য। সান ফেলিক্স থেকে কারাকাসে এসে ২২ বছর বয়সী ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন কারেলিস ডি'ওয়েন্ট। তিনি জানান, ধসে পড়া ভবন থেকে জীবিত উদ্ধার হলেও পরে হাসপাতালে মারা যান তার ভাই। পরিবারের আরও ১২ সদস্য এখনো নিখোঁজ, যাদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে। ভাইয়ের দাফনের খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, সেটিও এখন তার বড় দুশ্চিন্তা।