হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসককে মারধর, প্রতিবাদে কর্মবিরতি

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৩ এএম

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে ঢুকে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আব্দুল্লাহ আল কামালকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গতকাল রবিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনার প্রতিবাদে জরুরি বিভাগ ছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগসহ সব ধরনের চিকিৎসাসেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন চিকিৎসকরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে দুপুর ১টার পর কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে চিকিৎসাসেবা পুনরায় স্বাভাবিক করা হয়।

এদিকে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ফারুক হোসেন নামের এক ব্যক্তি হাসপাতালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। কিন্তু হাসপাতালের ভেতরে হামলা, হট্টগোল ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতির কারণে স্বজনরা তাকে চিকিৎসা না দিয়ে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ফারুক হোসেন উপজেলার জালাকান্দি এলাকার বাসিন্দা বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

স্থানীয় সাংবাদিকরা অভিযোগ করেছেন, হাসপাতালে হামলা ও চিকিৎসককে মারধরের সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য তাদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

হাসপাতাল সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আড়াইহাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়ার ছোট ভাই বিল্লাল হোসেন তার স্ত্রী ফিরোজা বেগমের পেটব্যথার চিকিৎসার জন্য সকালে জরুরি বিভাগে আসেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল কামাল প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীর স্বজনকে একটি ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনে আনতে বলেন। বিল্লাল ইনজেকশনটি কিনে এনে তা দ্রুত পুশ করার অনুরোধ করেন।

তবে ওই সময় জরুরি বিভাগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অন্য দুজন রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন আব্দুল্লাহ আল কামাল। এই নিয়ে বিল্লাল ও চিকিৎসকের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিল্লাল তার বড় ভাই ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়াকে ফোন করেন। এরপর ইউসুফের নেতৃত্বে বিএনপির ২০-৩০ জন নেতাকর্মী হাসপাতালে এসে ওই চিকিৎসককে বেধড়ক পেটানো শুরু করেন। চিকিৎসক দৌড়ে হলরুমে আশ্রয় নিলে, সেখান থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে এনে ফের মারধর করা হয়। এ খবরে আব্দুল্লাহ আল কামালের স্ত্রী (যিনি একই হাসপাতালে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত) মনোয়ারা বেগম ছুটে এলে স্বামীর সঙ্গে তাকেও আটকে রাখা হয়।

খবর পেয়ে আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সবজেল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে চিকিৎসককে উদ্ধার করে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল কামাল বলেন, ‘আমি জরুরি বিভাগে অন্য একজন গুরুতর আহত রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছিলাম। এ সময় বিল্লাল হোসেনকে কিছুটা অপেক্ষা করতে বলায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে দলবল নিয়ে এসে আমার ওপর হামলা চালান। আমার মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে, বুক-পিঠে আঘাতে পাশাপাশি হাতের একটি আঙুল ভেঙে গেছে বলে ধারণা করছি।’

হামলার ঘটনায় পুরো হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীরা ভয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন। চিকিৎসকদের সাময়িক কর্মবিরতির কারণে বহির্বিভাগে আসা সাধারণ রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

আড়াইহাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া হামলার বিষয়টি অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ফিরোজা বেগমকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট চিকিৎসা না দিয়ে তর্কে জড়ান। এ নিয়ে তাদের মধ্যে সামান্য ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসকরা এখন নানা নাটক সাজিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করছেন। আমার ভাইয়ের স্ত্রী এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন আবুল ফজল মুহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, হাসপাতালে কোনো সমস্যা হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে পারত। কিন্তু এভাবে ‘মব’ সৃষ্টি করে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের ওপর হামলা অত্যন্ত উদ্বেগজনক, যা চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে এবং তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাসে চিকিৎসকরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেছেন এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সবজেল হোসেন জানান, এ ঘটনায় বিকেল পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত