একসময় ‘শীতলপাটির গ্রাম’ নামে দেশব্যাপী পরিচিত ছিল পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সুবিদপুর গ্রাম। কচা নদীর তীরঘেঁষা এই গ্রামে এখনো শতাধিক কারিগরের হাতে বেঁচে আছে শত বছরের ঐতিহ্য। তবে প্লাস্টিক পণ্যের সহজলভ্যতা, কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি পরিবার নানা সংকট ও সংগ্রামের মধ্যেও পূর্বপুরুষের এই পেশা আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে কাউখালী উপজেলার সুবিদপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষ সবাই শীতলপাটি বোনার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময় তারা অভিযোগ করেন, কাঁচামাল ‘পাইত্রা’র তীব্র সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে প্লাস্টিকজাত পণ্যের সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম দামের কারণে শীতলপাটির চাহিদা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
সুবিদপুর গ্রামের কারিগর সজল দে বলেন, ‘কয়েকশ বছর ধরে আমাদের পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। একসময় কয়েকশ পরিবার শীতলপাটি তৈরি করত। এখন চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা বদল করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন।’
প্রবীণ কারিগর অনিল চন্দ্র পাটিকর বলেন, ‘একসময় দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ এই শিল্প দেখতে আসত। অনেক রাষ্ট্রদূতও এসেছেন। সবাই সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো সহায়তা পাইনি। সরকার যদি বিশেষ প্রণোদনা দিত, তাহলে এই শিল্প আবারও আগের অবস্থানে ফিরতে পারত।’
কারিগর আরতি রানী বলেন, ‘শুধু শীতলপাটি বিক্রি করে এখন সংসার চালানো খুব কঠিন। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যায় না। তাই অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তারপরও আমরা ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’ তিনি আরও জানান, সুবিদপুর গ্রামের কারিগররা শীতলপাটি তৈরির পাশাপাশি পাটি দিয়ে টিস্যু বক্স, পেন্সিল হোল্ডার, ব্যাগ, ওয়ালম্যাট, ট্রে, ল্যাম্পশেড, পাখির বাসা, ডাইনিং ম্যাটসহ ৪০টিরও বেশি নান্দনিক ও ব্যবহারিক পণ্য তৈরি করছেন। এতে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও নতুন বাজারের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরও শিল্পটির উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ কারণে কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যেতে পারে দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শীতলপাটি।
পিরোজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি গাজী ওয়াহিদুজ্জামান লাভলু বলেন, ‘রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে প্রদর্শনী ও স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, কারিগরদের প্রশিক্ষণ এবং কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিসিক পিরোজপুরের ভারপ্রাপ্ত উপব্যবস্থাপক ফাইজুর রহমান বলেন, ‘প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে সুবিদপুরের শীতলপাটি শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।’