সাগরে নিম্নচাপ পাহাড়ে ভয়

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

বঙ্গোপসাগরের উত্তর ওড়িশার ওপর দিয়ে একটি মৌসুমি নিম্নচাপ অতিক্রম করছে। আর এর প্রভাবে সৃষ্ট হওয়া জলীয়বাষ্পে দেশের উপকূলীয় এলাকা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনাসহ প্রভৃতি এলাকায় বেড়েছে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা। আর এই বৃষ্টিতে চট্টগ্রামসহ দেশের পার্বত্য এলাকায় ভূমিধসে বাড়তে পারে মৃত্যুঝুঁকিও। ঝুঁকি কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকাগুলোতে মাইকিং করা হচ্ছে।

বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ২০০৭ সালের ১১ জুন পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর থেকে প্রতি বছরই এক বা দুজনের মৃত্যু হচ্ছে পাহাড়ধসে। কখনো চট্টগ্রাম মহানগরীতে আবার কখনো রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি কিংবা কক্সবাজারে পাহাড়ধস হচ্ছে। এবারও বৈশাখের বৃষ্টিতে পাহাড়গুলোর মাটি ভেজার পর বর্ষার টানা বর্ষণ তেমন হয়নি। কিন্তু আগামী কয়েকদিন টানা বর্ষণ হতেপারে। আর টানা বর্ষণ হলেই পাহাড়ধস নিয়ে শঙ্কায় থাকে প্রশাসন। এই শঙ্কা উঠে এসেছে শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীনের কথায়ও। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছর পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এবার কিন্তু এখনো তা করা হয়নি। এমনকি শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাও হয়নি। তবে শিগগিরই সভার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।’

কিন্তু এবার উচ্ছেদ অভিযান না হলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাইকিং করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত। তিনি বলেন, আমরা বৈশাখে বৃষ্টির শুরুর সময় থেকে এলাকাগুলোতে আমাদের প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে মাইকিং করছি।

মাইকিংয়ে কি বলা হচ্ছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা পাহাড়ের পাদদেশের বসতিদের বৃষ্টির সময় নিরাপদে সরে আসতে বলছি। নিরাপদ কোনো আশ্রয় কিংবা জেলা প্রশাসনের আশ্রয়কেন্দ্রে এসে অবস্থানের জন্য বলা হচ্ছে। এতে তাদের জানমাল রক্ষা হবে।

অন্যান্য বছর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এবার তা করা হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নাগরিকের আবাসস্থলের অধিকার রয়েছে। আমরা কারও বাসস্থান উচ্ছেদ করে অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাই না। সেজন্য তাদের উচ্ছেদ না করে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছি এবং দুর্গত সময়ে জানমাল রক্ষায় তাদের নিরাপদে সরে আসতে বলছি।’

এবার কি ভারী বৃষ্টি হবে? : আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্তে দেখা যায়, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে কক্সবাজারে ১০১ মিলিমিটার। এ ছাড়া একই সময়ে কুতুবদিয়ায় ৮৩ মিলিমিটার, টেকনাফে ৬৩, পটুয়াখালীতে ৬০, খেপুপাড়ায় ৫৬, হাতিয়ায় ৪৪ ও চট্টগ্রামে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এ ছাড়া দেশের মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোতে বৃষ্টিপাতের মাত্রা কম। কিন্তু কাল মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে বলে জানান আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোকাস্টিং কর্মকর্তা তারিফুল নেওয়াজ কবির। তিনি বলেন, ‘আজ সোমবারও দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত হবে। তবে নিম্নচাপটি আজ সোমবার পুরোপুরি ওড়িশা উপকূলে উঠে যাওয়ার পর কাল মঙ্গলবার থেকে দেশের উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি সারা দেশে ভারী বৃষ্টিপাত থাকবে ১১ জুলাই শনিবার পর্যন্ত। এজন্য ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।’

টানা বৃষ্টি পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ায় : চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো বালি মাটির পাহাড়। তাই টানা বর্ষণ হলে এসব মাটি ভিজে গলে যায় এবং পাহাড়ধস হয়।

এই পাহাড়ধসকে আরও বাড়িয়ে দেয় পাহাড় কাটা কার্যক্রম। পাহাড়গুলো খাড়া করে কাটার কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এ বিষয়ে কথা হয় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে অবাধে পাহাড় কর্তন। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পাহাড় কাটা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলেও থেমে নেই পাহাড় কাটা। পাহাড়গুলো খাড়া করে কাটার কারণে টানা বৃষ্টিতে এসব পাহাড় ধসে পড়ে এবং জানমালের ক্ষতি হয়।

এ বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভৌগোলিক কাঠামোগত কারণেই চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়গুলোতে বালিমাটির আধিক্য বেশি। তাই বর্ষাকালে টানা বর্ষণ হলে এবং অর্ধকাটা অবস্থায় থাকলে পাহাড়ধসের হার বেশি থাকে। এ ছাড়া বিগত সময়ে ধসে পড়া সব পাহাড়ই অর্ধকাটা অবস্থায় ছিল।

কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ধসে মানুষ মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে কম। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড. অলক পাল বলেন, আবহাওয়াগত উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বিগত কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিপাতের হার কম। একই সঙ্গে জনসচেতনতাও বাড়ছে। তাই হয়তো পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনা কম হচ্ছে।

এদিকে ড. অলক পালের কথার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় আবহাওয়া অধিদপ্তরেরও উপাত্তে। উপাত্তে দেখা যায়, গত বছরও বর্ষাকালে দেশে বৃষ্টি কম হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে জুনে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। ২০২৩ সালে ১৪ শতাংশ কম হয়েছে এবং ২০২২ সালে ৩ শতাংশ কম হয়েছে। অপরদিকে জুলাই মাসে ২০২৪ সালে ৫ শতাংশ বেশি হলেও ২০২৩ সালে ৩৮ শতাংশ ও ২০২২ সালে ৫৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। অপরদিকে নগরী ও বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে প্রায় সাবাড় করে ফেলায় পাহাড়ের সংখ্যাও কমে এসেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ১১ জুনের প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যুর পর শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল মৃত্যু বন্ধ করার জন্য। সেই কমিটি গত ১৯ বছরে প্রায় ৩২টি মিটিং করলেও পাহাড়ধসে মৃত্যু ঠেকানোর কৌশল বের করতে পারেনি। মৃত্যু ঠেকাতে শত সুপারিশ ও প্রস্তাবনা এলেও তা বাস্তবায়ন শূন্যতায় সব কাগজে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তবে সব মিটিংয়ের প্রধান সিদ্ধান্ত ছিল পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এবার সেই বিচ্ছিন্নের পরিবর্তে জনসচেতনতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত