আল্লাহর পথে ব্যয়ের উপমা

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৪ এএম

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানা সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর। মানুষ কেবল সেই সম্পদের সাময়িক তত্ত্বাবধায়ক মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মন থেকে লোভ ও কৃপণতা দূর করতে সাহায্য করে। সম্পদ কেবল নিজের কুক্ষিগত করে রাখার মাঝে কোনো প্রকৃত সুখ বা সফলতা নেই। বরং তা সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রবাহিত হওয়ার মাঝেই রয়েছে সুষম অর্থনীতির ভারসাম্য। আল্লাহ তার বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে অভাবীদের সাহায্য করতে। মানুষ যখন নিঃস্বার্থভাবে দান করে, স্রষ্টা সেই দানকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে তার আমলনামায় যুক্ত করেন।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা উৎপন্ন করে সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা বাকারা ২৬১)

দানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিয়ত বা উদ্দেশ্যের বিশুদ্ধতা। লোকদেখানো বা মানুষের কাছে সুনাম কুড়ানোর জন্য যে দান করা হয়, তাতে কোনো ফায়দা নেই। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দান বাতিল করো না সেই ব্যক্তির মতো, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথরের মতো, যার ওপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফের জাতিকে হেদায়াত দেন না।’ (সুরা বাকারা ২৬৪) তাই দানের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। দান যেন প্রশংসা পাওয়া বা লোকদেখানোর জন্য না হয়।

আর দানের বহুগুণ বৃদ্ধির উপমাটি কেবল পরকালীন সওয়াবের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। সমাজের ধনী ব্যক্তিরা যখন তাদের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রদের জন্য ব্যয় করে, তখন সমাজে অর্থের সুষ্ঠু প্রবাহ বাড়ে। এর ফলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হয়, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একজন মানুষের একটি ছোট দান হয়তো একজন অভাবী মানুষের তাৎক্ষণিক ক্ষুধার নিবৃত্তি করে, অথবা একটি অনাথ শিশুর শিক্ষার সুযোগ করে দেয়। সেই শিশুটি একদিন বড় হয়ে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয় এবং সেও তার অবস্থান থেকে আরও অনেককে সাহায্য করার সামর্থ্য অর্জন করে। এভাবেই একটি ছোট দান কালের পরিক্রমায় বিশাল এক মহিরুহে পরিণত হয়, যার ছায়ায় হাজারো মানুষ আশ্রয় পায়। ঠিক যেমন একটি ক্ষুদ্র বীজ থেকে সাতশ দানার জন্ম হয়, তেমনি একটি সৎ উদ্যোগ পুরো সমাজকে আমূল বদলে দিতে পারে।

মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও দানের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরাও এখন স্বীকার করছেন, অন্যের জন্য কিছু করার মাঝে মানুষ এক ধরনের গভীর আত্মতৃপ্তি খুঁজে পায়। যখন একজন মানুষ তার কষ্টার্জিত সম্পদ স্বেচ্ছায় অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বিলিয়ে দেয়, তখন তার মন থেকে বস্তুবাদী লোভ ও দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত মায়া ধীরে ধীরে দূর হতে থাকে। আত্মিক এই পরিশুদ্ধি তাকে একজন উন্নত ও পরিশালিত মানুষে পরিণত করে। পবিত্র কোরআনে বারবার এই আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আসলে দাতা দান করে গ্রহীতাকে অনুগ্রহ করছে না, বরং গ্রহীতা সেই দান গ্রহণ করে দাতার আত্মশুদ্ধি ও পরকালীন মুক্তির পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে। এই গভীর দর্শন অনুধাবন করতে পারলে সমাজের কোনো বিত্তবান ব্যক্তি আর কখনোই নিজের সম্পদ নিয়ে অহংকার করবে না।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত