মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণে থাকা সশস্ত্র জাতিগত সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইনের ঐতিহাসিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে কয়েকটি শহরের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি এএর নিয়ন্ত্রণে আসা পকতাও শহরের নতুন নাম রাখা হবে বীরট্টানি, যার অর্থ ‘বীরদের আবাস’। আর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দখলে নেওয়া মিনব্যা শহরের নাম পরিবর্তন করে অঞ্জনাপুর রাখা হবে, যার অর্থ ‘অঞ্জনার নগরী’।
প্রাচীনকালে রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বর্তমান লেমিও নদী ‘অঞ্জনা’ নামে পরিচিত ছিল। প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী চিন রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
এএর ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, ভবিষ্যতে মংডু ও সিত্তে জেলার আরও কয়েকটি শহরের নামও পরিবর্তন করা হতে পারে। তবে কোন কোন শহরের নাম বদলানো হবে, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
একটি সূত্র জানায়, ‘এখন পকতাও ও মিনব্যার নাম পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। পরে আরও অনেক শহরের নাম পরিবর্তন করা হতে পারে।’
ইতিহাসবিদদের মতে, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত ধান্যবতী, ভেসালি, লাংম্রো ও ম্রাউক-ইউ—এই চারটি রাজবংশের অধীনে আরাকান (রাখাইন) রাজ্য সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। সে সময় রাজ্যটিতে ১৭টি রাজকীয় রাজধানী ও অসংখ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল। প্রায় ২৪০ বছর আগে বার্মিজ বাহিনীর দখলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সেই রাজ্যের পতন ঘটে।
মিনব্যার সত্তরোর্ধ্ব এক বাসিন্দা বলেন, ‘নতুন যেসব নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো ঐতিহাসিক সূত্র থেকেই নেওয়া হয়েছে। লাংম্রো ও ম্রাউক-ইউ আমলে মিনব্যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গনগর।’
নাম পরিবর্তনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এএর রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউএলএ), গ্রিন আরাখা প্রকল্প এবং স্থানীয় তরুণরা পকতাও ও মিনব্যার বিভিন্ন সড়কের পাশে গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বর্তমানে ইউএলএর অধীনে এএ নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। এর আওতায় প্রশাসন, বিচার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা বিভাগ রাখাইন ভাষায় নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক (গ্রেড-১২) পর্যায়ে বার্মিজ ভাষার পরিবর্তে রাখাইন ভাষা চালু করা হবে।
সূত্র জানিয়েছে, গ্রেড-১২-এর নতুন রাখাইন ভাষার পাঠ্যক্রম ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে এবং প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এটি চলতি শিক্ষাবর্ষে নয়, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর হতে পারে।
২০২৫ সালে এএ তাদের নিয়ন্ত্রিত রাখাইনের ১৪টি টাউনশিপ এবং পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের পালেতওয়া টাউনশিপকে পুনর্গঠন করে আটটি প্রশাসনিক জেলায় ভাগ করেছে।
এএর প্রধান তুন ম্রাত নাইং ২০২৭ সালের মধ্যে সিত্তে, কিয়াউকফিউ ও মানাউং—রাখাইনের অবশিষ্ট তিনটি টাউনশিপও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে সিত্তে ও কিয়াউকফিউ এলাকায় সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এএ বর্তমান জনপদগুলোর সঙ্গে প্রাচীন রাখাইন রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং সেই ইতিহাসকে বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
রাখাইনের এক তরুণ দ্য ইরাবতীকে বলেন, ‘পুরোনো নাম ও ঐতিহাসিক পরিচয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানুষ সুশাসন ও নিরাপত্তা পাচ্ছে কি না।’
উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সামরিক সরকারও অতীতে বিভিন্ন সময় শহর ও সড়কের নাম পরিবর্তন করেছিল। বিশেষ করে ১৯৮৮ সালের অভ্যুত্থান এবং সাবেক সামরিক শাসক থান শ্বের আমলে রাজধানী নেপিদোর বিভিন্ন টাউনশিপের নাম পালি ভাষার শব্দ অনুসারে পরিবর্তন করা হয়েছিল।