ন্যাটো সম্মেলনের আগে উত্তেজনা

কিয়েভে রুশ হামলায় নিহত ২৪

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৪২ এএম

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সোমবার অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। গত এক সপ্তাহের মধ্যে এটি কিয়েভে রাশিয়ার দ্বিতীয় বড় ধরনের হামলা। গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সম্মেলনের প্রাক্কালে চালানো এই হামলায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মিত্র দেশগুলোর কাছে আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়া কিয়েভের আবাসিক ভবনগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর কয়েক দিন আগেও রুশ হামলায় কিয়েভে ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।

জেলেনস্কি এই হামলাকে 'বর্বর আক্রমণ' হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রাশিয়ার কৌশল অপরিবর্তিত রয়েছে। তারা ইউক্রেনের মানুষ ও দেশের ওপর যতটা সম্ভব ক্ষতি ও যন্ত্রণা চাপিয়ে দিতে চায়।

তিনি জানান, ইউক্রেন ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের নেই। জেলেনস্কি বলেন, আধুনিক বিশ্বে এমন পরিস্থিতি 'অযৌক্তিক', যেখানে মানুষকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা থেকে রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে মিত্র দেশগুলোকে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

কিয়েভে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ

হামলার সময় কিয়েভের পোদিলস্কি জেলায় একটি বহুতল আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে ভবনটির কয়েকটি তলা ধ্বংস হয়ে যায়। হামলার সময় আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ ও আলোর ঝলকানি দেখা যায়।

কিয়েভে ১৬ জন এবং রাজধানীর কাছের ভিশনেভে শহরে আরও ৮ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আহত হয়েছেন ১০০ জনের বেশি মানুষ।

জেলেনস্কির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ওই রাতে ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৫১টি আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ব্যালিস্টিক ধরনের।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝিয়াতেও হামলায় দুইজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন ১৮ বছর বয়সী তরুণী।

ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান

হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনগুলোতে তল্লাশি চালান এবং মৃতদেহ উদ্ধার করেন। অনেক বাসিন্দা আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন।

৬০ বছর বয়সী কিয়েভের বাসিন্দা ওলেক্সান্ডার কোলোমিয়েটস বলেন, ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়েছে প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

৩৬ বছর বয়সী আন্না মিসকো জানান, তিনি ও তার সন্তান অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন। হামলার সময় তারা ভবনের নিচতলায় নেমে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনকে ধ্বংস করতে চায় এবং দেশে কোথাও এখন আর পুরোপুরি নিরাপদ জায়গা নেই।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের সামরিক শিল্প স্থাপনা, জ্বালানি ও জ্বালানি-সংক্রান্ত অবকাঠামো।

কিয়েভের বাসিন্দা ওলেক্সান্ডার সেলেজনভ বলেন, যুদ্ধ একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার মতে, রাশিয়া কিয়েভকে বেসামরিক মানুষের বসবাসের অনুপযোগী করে তুলতে চাইছে।

কর্মকর্তারা জানান, কিয়েভে প্রায় ৩০টি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভিশনেভে শহরে প্রায় ৫০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সাইবেরিয়ার রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা

কিয়েভে হামলার মধ্যেই ইউক্রেনের সেনাবাহিনী জানায়, তারা রাশিয়ার ওমস্ক অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওই স্থাপনায় এটি ছিল ইউক্রেনের অন্যতম গভীর হামলা।

জেলেনস্কি জানান, এই অভিযানে ইউক্রেন নিজেদের উন্নত 'ফায়ার পয়েন্ট' ড্রোন ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, এখন সাইবেরিয়াও ইউক্রেনের নির্ভুল হামলার আওতার মধ্যে এসেছে।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ওমস্কের ওই তেল শোধনাগার রুশ সেনাবাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে ওমস্কের গভর্নর জানিয়েছেন, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

অন্যদিকে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা রাতভর ৫০০টির বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুদ্ধ বন্ধের যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, তা এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ন্যাটো সম্মেলনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠক হবে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে যুদ্ধ শেষ করার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও এ বিষয়ে যোগাযোগ করবেন।

সূত্র: ফ্রান্স ২৪

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত