টানা বর্ষণের পর পাহাড় বেয়ে নেমে আসা সাদা ফেনিল জলধারা, পাথুরে ঝিরিপথ আর প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর আবহে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো। বর্ষার পূর্ণ রূপে সেজে ওঠা এসব ঝর্ণা এখন পরিণত হয়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের অন্যতম আকর্ষণকেন্দ্রে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে হাজারো মানুষ ছুটে আসছেন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে।
'ঝর্ণার রানী' হিসেবে পরিচিত মিরসরাইয়ে রয়েছে রূপসী ঝর্ণা, হরিণাকুণ্ড ঝর্ণা, নাপিত্তাছড়া ঝর্ণা, সোনাইছড়ি ঝর্ণা, বোয়ালিয়া ঝর্ণা, খৈয়াছড়া ঝর্ণা এবং জনপ্রিয় মেলখুম ট্রেইল। বছরের অন্য সময় অনেক ঝর্ণা পানির প্রবাহ কম থাকলেও বর্ষায় সেগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। তাই এ সময়টিই প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভ্রমণকারীদের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানের প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ একর বনাঞ্চলজুড়ে রয়েছে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, রূপসী, সোনাইছড়ি ও বাওয়াছড়া ঝর্ণা। আকৃতি, সৌন্দর্য ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া ও রূপসী ঝর্ণায় পর্যটকের ভিড় সবচেয়ে বেশি।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপসী, নাপিত্তাছড়া ও খৈয়াছড়া ঝর্ণার প্রবেশপথে সারি সারি বাস, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আবার অনেক পর্যটক দূরপাল্লার বাসে এসে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ঝর্ণার উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। পর্যটকের চাপ বাড়ায় স্থানীয়ভাবে খাবার, পানীয়, ট্রেকিং সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রিও বেড়েছে।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা সুবিক নামে এক পর্যটক বলেন, মিরসরাইয়ের ঝর্ণার কথা খুব শুনতাম লোকমুখে। সেখান থেকেই ঝর্ণাগুলো দেখতে আসার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। প্রথমবার খৈয়াছড়া ঝর্ণায় এলাম। পথটা যদিও একটু দুর্গম। কিন্তু ঝর্ণার যত নিকটে যাচ্ছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। যখনই ঝর্ণার কাছে গেলাম পথের সব কষ্ট এক মুহুর্তেই মুছে গেলো। এত সুন্দর এ ঝর্ণা, আমার কল্পনাকেও ছাড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে আসা ফাহাদ বলেন, আমরা কয়েকজন কলিগ মিলে ঝর্ণা দেখতে এসেছি। এর আগেও বেশ কয়েকবার খৈয়াছড়া ঝর্ণায় গিয়েছিলাম। আজ নাপিত্যাছড়া ঝর্ণা দেখলাম। দুটি ঝর্ণার সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য একেবারেই ভিন্ন।
তবে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঝর্ণায় রয়েছে যেকোন দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। পর্যটকদের অসচেতনতা, অনভিজ্ঞতা ও অতিরিক্ত সাহসিকতার কারণে প্রতিবছরই বিভিন্ন ঝর্ণায় দুর্ঘটনা ঘটে। তাই সংশ্লিষ্টরা নিরাপদ ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঝর্ণাগুলোতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ২০১০ সাল থেকে ঝর্ণাগুলো ইজারা দিয়ে আসছে বন বিভাগ। চলতি বছরের ২৩ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৪ মে পর্যন্ত এক বছরের জন্য ৪০ লাখ ১০০ টাকায় ঝর্ণাগুলোর ইজারা পেয়েছে থ্রি-বি নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
ঝর্ণাগুলোর ইজারাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান থ্রি-বির কর্মকর্তা এস. এম. হারুন বলেন, বর্ষাকালে পর্যটকের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই প্রবেশপথে কাউন্সেলিং, সচেতনতামূলক ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন টানানো হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং সব পর্যটককে গাইড সঙ্গে নেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। আজ ঝর্ণায় পানির পরিমান অতিরিক্ত। পাহাড়ি ঢল নামায় পর্যটক পানিতে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। যে কারণে আজ সবগুলো ঝর্ণার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। পর্যটক যারা আসছেন তাদের কাউন্সেলিং করে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। পানি কমলে পুনরায় কার্যক্রম চালু হবে।
বারৈয়ারঢালা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, বৈশাখ থেকেই ঝর্ণাগুলোতে পানির প্রবাহ শুরু হয়েছে। পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে। নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে ইজারাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে হ্যান্ডমাইকে প্রচার, নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং সচেতনতামূলক ব্যানার-পোস্টার স্থাপন করা হয়েছে।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে মিরসরাইয়ের পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো দিন দিন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এখানে আসছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বন বিভাগ ও ইজারাদার সমন্বিতভাবে কাজ করছে।