বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চে আর্জেন্টিনার বিশ্বখ্যাত রক্ষণভাগ তখন মাঝমাঠ থেকে অতর্কিত এক আক্রমণের মুখে। ডিফেন্স পজিশন থেকে বিদ্যুৎ গতিতে বল কেড়ে নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে আলবিসেলেস্তেদের বক্সে ঝড়ের বেগে ঢুকে পড়লেন এক মিসরীয় তরুণ। আর্জেন্টিনার শক্তিশালী ডিফেন্সকে স্রেফ গতি আর চতুর ড্রিবলিংয়ে বোকা বানিয়ে বল জড়িয়ে দিলেন জালে। তিনি মোস্তফা জিকো।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে হেরে মিসর বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও, ফুটবলবিশ্বের নতুন বিস্ময় এই জিকো। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার স্তব্ধ রক্ষণকে ফাঁকি দিয়ে দুবার জালে বল পাঠিয়েছিলেন ২৯ বছর বয়সী এ ফরোয়ার্ড। যদিও বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তের কারণে তার প্রথম গোলটি বাতিল হয়। তবে এর ঠিক ৬ মিনিট পরেই হুবহু আরেকটি দর্শনীয় গোল করে নিজের জাত চেনান তিনি। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে জিকোর এমন একক প্রভাব ও ক্ষিপ্র গতি এখন ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে।
মোস্তফা জিকোর এই উত্থান গল্পকেও হার মানায়। মিসরে সাধারণত নামকরণের ক্ষেত্রে পারিবারিক বা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য মেনে চলার যে চল রয়েছে, যেই ছোঁয়া আছে তার নামের পেছনেও। মোস্তফার পুরো নাম মোস্তফা মোহামেদ জ্যাকি আবদেলরাউফ। এখানে ‘জ্যাকি’ নামটি এসেছে তার দাদার নাম থেকে।
তবে তার ‘জিকো’ হয়ে ওঠার গল্পটি বেশ আবেগের। মূলত তার বড় ভাই আবদেলরাউফ যখন ফুটবল খেলতেন, তখন লম্বা নামের কারণে চাচা ভালোবেসে তাকে ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার জিকোর নামানুসারে ‘জিকো’ বলে ডাকতেন। ১৪ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব নিতে বড় ভাই নিজের ফুটবল ক্যারিয়ার কোরবানি দিয়ে কাপড়ের দোকানে কাজ শুরু করেন, যেন ছোট ভাই মোস্তফা তার স্বপ্নপূরণ করতে পারেন। তখন থেকেই মোস্তফাকে ‘ছোট জিকো’ বলা হতো এবং পরে বড় ভাই খেলা ছাড়লে মোস্তফা হয়ে উঠেন শুধুই ‘জিকো’।
বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে মে মাসে প্রধান কোচ হোসাম হাসানের অধীনে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া এই ফরোয়ার্ডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার মাত্র ৭ ম্যাচের। তবে এই অল্প সময়েই তিনি বড় বড় দলের বিপক্ষে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন। বিশ্বকাপের আগে জুন মাসের শুরুতে ব্রাজিলের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে পিএসজি তারকা মার্কিনহোসের ভুল থেকে দুর্দান্ত এক গোল করেছিলেন এই মিসরীয় জিকো, যা দেখে খোদ আসল ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি জিকো (হোয়াইট পেলে) ভিডিওবার্তা পাঠিয়ে মোস্তফাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একই ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করে মোহামেদ সালাহর পাশে নিজের নাম লেখান তিনি। নিচের সারির ক্লাব থেকে উঠে এসে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের জালে বল পাঠিয়ে মোস্তফা জিকো প্রমাণ করলেন তিনিই আফ্রিকার ফুটবলের নতুন গতিদানব।