টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে আরও সাতজন মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার কক্সবাজার ও বান্দরবানে পৃথক ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে বান্দরবানে পাঁচজন এবং কক্সবাজারে দুইজন মারা যান। এর আগে গত চার দিনে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও অনেকেই সেটি মানছে না।
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, জেলার লামা উপজেলায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজন এবং অপর ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী মারা যান। গতকাল ভোরে উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায় এই দুটি দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন আজিজনগরের বাসিন্দা মো. ইউনুস (৪০), তার স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মো. সোলেমান। অপর ঘটনায় নিহত হয়েছেন মো. জুয়েল (৩৪) ও তার স্ত্রী কুলছুমা আক্তার (২৫)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টির মধ্যে ভোরে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা চিৎকার শুনে পৃথক স্থানে মাটিচাপা পাঁচজনকে উদ্ধার করলেও তারা সবাই মারা যান। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, একই এলাকায় পৃথক দুই পাহাড়ধসের ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এদিকে টানা বৃষ্টিতে লামাসহ বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, জেলার চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার দিবাগত রাত ১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন বরইতলী ইউনিয়নের আবদুল মজিদের ছেলে তৌসিফ উদ্দিন (১৩) ও কাজলের মেয়ে রুমি আক্তার। স্থানীয় সূত্র জানায়, গভীর রাতে টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে তাদের বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে তারা মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় তাদের উদ্ধার করলেও ততক্ষণে দুজন মারা যায়। এ ঘটনায় একই এলাকার আব্দুল জলিলের স্ত্রী ও কন্যা আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চকরিয়া ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের সরিয়ে নিচ্ছে প্রশাসন : টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পাহাড়ধসে ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছে প্রশাসন। পাহাড়গুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবীরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল থেকে ইতোমধ্যে এক হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে দুর্যোগের মধ্যেও অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী সতর্কতা উপেক্ষা করে ঘরবাড়ি ছাড়ছে না, যা উদ্ধার ও স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ‘টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়েছে। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ সব পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে আমাদের টিম কাজ করছে।’ ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ‘নতুন করে কোনো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য আমরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সিলগালা করে দিচ্ছি এবং মানুষকে জোরপূর্বক হলেও নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিচ্ছি।’